শিশুকে হত্যার ঘটনা গোপন করায় নারীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০২:০৮ পিএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০২:১৬ পিএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭
শিশুকে হত্যার ঘটনা গোপন করায় নারীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

রাজশাহীর মোহনপুরে চাঞ্চল্যকর শিশু ফজলে হোসেন রাব্বি (১০) হত্যা মামলায় আসিনুর বেগম নামের এক নারীর আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে তাকে। হত্যাকাণ্ডের খবর জেনেও গোপন করার দায়ে তাকে এ দণ্ড দেয়া হয়েছে।

ওই মামলায় আরও তিন আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শিরীন কবিতা আখতার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, মোহনপুর উপজেলার বেড়াবাড়ি ডাইংপাড়া গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে মাজেদুর রহমান ওরফে সাগর (১৯), আবদুর রাজ্জাকের ছেলে রিপন সরকার ওরফে লিটন (২৫) এবং হযরত আলীর ছেলে নাজমুল ইসলাম (২৫)। এদের প্রত্যেককে তিন হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এ মামলায় সাগরের বাবা আবুল কাশেমসহ আরও দুজন আসামি ছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস দেন। এরা হলেন, একই গ্রামের মো. আলাউদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম (৩০) এবং আবদুল হাকিমের ছেলে মো. সাহাবুদ্দিন (২৪)। রায় ঘোষণাকালে আসামিরা আদালতে কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

rajshahi

আদালতের বিশেষ পিপি এন্তাজুল হক বাবু এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর বেড়াবাড়ি ডাইংপাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে ফজলে হোসেন রাব্বিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মামলার ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এ রায় ঘোষণা করলেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর আসামি নাজমুল ও রিপন শিশু রাব্বিকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য সাগরের সঙ্গে পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সাগর ওই শিশুকে ডেকে নিয়ে যান। সাগরের বাড়ির পাশে আসামি নাজমুল ও রিপন আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন।

সেখানে রাব্বিকে নিয়ে যাওয়া হলে রিপন ও নাজমুল রাব্বিকে ধারালো হাঁসুয়া দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন। এসময় রাব্বির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। কেটে নেয়া হয় দুই হাত এবং জিহ্বাও। এরপর তার লাশ বিলের মধ্যে নিয়ে গিয়ে একটি নালার ভেতর রেখে মাটিচাপা দেয়া হয়।

এ ঘটনার পরদিন ছেলে নিখোঁজ থাকার ব্যাপারে আবুল হোসেন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর ওই দিনই বিকেলে সাহাবুদ্দিন আবুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে জানান, রাব্বি নিখোঁজ থাকার ব্যাপারে কেউ একজন মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা বলবেন।

এসময় সেখানে উপস্থিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফোনটি ধরলে তাকে জানানো হয়, রাব্বি তাদের হেফাজতে আছে। তাকে ফেরত পেতে হলে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে।

কথা বলার সময় ফোনের ওপাশের ওই ব্যক্তির কথা রেকর্ড করা হয়। এরপর তা শুনে গ্রামবাসী ধারণা করেন, কণ্ঠটি গ্রামের আমিনুলের। যোগাযোগের স্বার্থে সাহাবুদ্দিনের মুঠোফোনটি ওই সময় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছেই রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ওই মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর থানায় একটি অপহরণের মামলা করা হয়। মামলার পর পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে।

অনুসন্ধানের একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, যে মুঠোফোন থেকে কল দিয়ে আবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে সে ফোনে অন্য একটি সিম ব্যবহার করা হচ্ছে। এরপর পুলিশ সাহাবুদ্দিনের মুঠোফোন থেকেই ওই নম্বরটিতে যোগাযোগের চেষ্টা করলে দেখা যায়, সাহাবুদ্দিনের ফোনে ‘আসিনুর কাকি’ নামে নম্বরটি সেভ করা আছে।

এরপর পুলিশ আসিনুরের বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় মুঠোফোন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আসিনুর, তার স্বামী কাশেম এবং ছেলে সাগরকে গ্রেফতারও করা হয়। পরদিন সাগর হত্যাকাণ্ডে জড়িত স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ পরে রিপন ও নাজমুলকে গ্রেফতার করে। ফোনে কথা বলেছেন, এমন সন্দেহে গ্রেফতার করা হয় আমিনুলকেও।

এরপর ২৬ ডিসেম্বর শিশু রাব্বির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আসিনুর বেগমও আদালতে জবানবন্দি দেন।

তিনি তার জবানবন্দিতে বলেন, বাড়ির পাশে হত্যার সময় রাব্বির চিৎকার শুনে তিনি সেখানে গেছিলেন। তাকে হত্যা করতে দেখেছেন। কিন্তু আসামি নাজমুল ও রিপন তাকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, ঘটনা প্রকাশ করলে তাকে এবং তার স্বামীকেও হত্যা করা হবে। তাই তিনি কারও কাছে ঘটনা প্রকাশ করেননি।

রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেছেন, ঘটনা জেনেও প্রকাশ না করাটিও অপরাধ। এ অপরাধে আসিনুর বেগমকে অামৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হলো। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তাই তাদের সাজা দেয়া হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগপত্রে এই সাতজনকেই অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

ফেরদৌস সিদ্দিকী/এমএএস/আইআই