সারের প্রতি বস্তায় ৫ কেজি কম, উত্তোলন বন্ধ ডিলারদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:০৪ পিএম, ২৭ মার্চ ২০১৮
সারের প্রতি বস্তায় ৫ কেজি কম, উত্তোলন বন্ধ ডিলারদের

ওজনে কম দেয়ায় রাজশাহীর বাফার গুদাম থেকে ইউরিয়ার সার উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন সার ডিলাররা। মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ অঞ্চলের কোনো ডিলার বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন করেননি।

ডিলারদের ভাষ্য, প্রতি বস্তায় দুই কেজি থেকে ৫ কেজি করে ইউরিয়া কম থাকছে। প্রতি ট্রাকে অন্তত ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার ইউরিয়া কম পাচ্ছেন তারা। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ডিলারদের।

গত দুই মাস ধরে ওজন কারচুপি চলে আসলে এক সপ্তাহ ধরে চলছে ব্যাপকভাবে। গুদাম কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মিলছে না।

এ নিয়ে সম্প্রতি জেলা প্রশাসক, কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও বিসিআইসি কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন ডিলাররা। অভিযোগ গেছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনেও (বিএফএ)। এরপরও থামছে না ওজন কারচুপি।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএফএ রাজশাহী শাখার সভাপতি ওছমান আলী। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরেই ওজন কারচুপি চলে আসছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে তা চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতি বস্তায় নূন্যতম দুই-পাঁচ কেজি করে ইউরিয়া কম থকছে। প্রতি ট্রাকে অন্তত ১৫ হাজার টাকা লোকসান গুনছে ডিলাররা। ওজন কম দেয়ায় বরাবরই তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন ডিলাররা।

তিনি আরও বলেন, ওজন কম দেয়ায় মঙ্গলবার সকালে কয়েকজন ডিলার সার উত্তোলনে অপারগতা জানান। খবর পেয়ে তিনি বাফার গুদামে যান। কয়েকটি বস্তা ওজন করে কম দেয়ার বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে বিএফএর কেন্দ্রীয় কমিটির পরিচালক অসিত কুমার ঘোষ বলেন, গুদাম থেকে সার নেয়ার সময় ৫০ কেজি ওজন বুঝে নেবেন ডিলাররা। এর কম হলে তারা ডিলারদের বরাদ্দকৃত ইউরিয়া সার উত্তোলনে নিষেধ করেছেন। বিষয়টি বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন তারা। অচিরেই এই সংকট কেটে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।

বিএফএ রাজশাহী জেলা শাখা জানিয়েছে, রাজশাহীতে ৮৯ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৭ জন বিসিআইসির সার ডিলার রয়েছেন। তারাই কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সার বিপণনে যুক্ত। রাজশাহী বাফার গুদাম থেকে এ দুই জেলায় যায় ইউরিয়া সার। বর্তমানে গুদাম থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে আমদানিকৃত গ্রানুলার ইউরিয়া।

রাজশাহী বাফার গুদামে সার সরবরাহ করছে সাউথ ডেল্টা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেড, শিপিং, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট গ্রামসিকো লিমিটেড এবং নবাব অ্যান্ড কোম্পানি। প্রতিটি কোম্পানির ট্রাকভর্তি সারে ওজনে কারচুপি ধরা পড়ছে।

বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী বাফার গুদামের হিসাব কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে গুদামে ১৯ ট্রাক ইউরিয়া এসেছে। এর মধ্যে তিন ট্রাকে মিলেছে পরিমাণমত সার। বাকিগুলোতে প্রতি বস্তায় দুই কেজি থেকে সাড়ে ৪ কেজি পর্যন্ত ওজন কম পাওয়া গেছে। বিষয়টি তারা পরিবহন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তারা নতুন করে বস্তাবন্দি করে ঘাটতি পূরণ করছেন।

দুপুরে বাফার গুদামে গিয়ে কর্মীদের পাওয়া গেলো ইউরিয়া পুনরায় বস্তাবন্দিরত অবস্থায়। তারা জানিয়েছেন, কয়েক হাজার বস্তা ইউরিয়া নতুন করে বস্তাবন্দি করছেন। ৬৫ জন কর্মী সকাল থেকে এ কাজ করছেন। ৫০ কেজির বস্তা করে গুদামের এক কোনে ফেলছেন সার। কোন ধরনের তদারকি ছাড়াই চলেছে এই কাজ।

রাজশাহী বাফার গুদামে ছিলেন গ্রামসিকো লিমিটেডের প্রতিনিধি হুমায়ুন কবীর। তিনি জানান, তারা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বস্তাবন্দি ইউরিয়া এনেছেন। তাদের দুটি ট্রাকের ভেতর একটি ট্রাকের ৪০০ বস্তায় ওজনে কম পেয়েছে বাফার গুদাম কর্তৃপক্ষ। সেগুলো নতুন করে বস্তা করছেন তারা।

তার দাবি, ওজন কারচুপিতে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তারা কেবল বহন করেন। কারা এতে যুক্ত তারা সেটিও জানেন না। বস্তায় ওজনে কম থাকায় তাদেরও মোটা অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে দাবি তার।

রাজশাহী বাফার গুদামের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মার্চে রাজশাহী বাফার গুদামে ইউরিয়া সার বরাদ্দ রয়েছে ৮ হাজার ৮৩৪ টন। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে ১০ হাজার ২৪ দশমিক ৫৫ টন। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী জেলায় ৮ হাজার ৮২৯ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫ হাজার ৩৫৪ টন ইউরিয়া বরাদ্দ ছিল। জানুয়ারিতে রাজশাহীতে ৮ হাজার ২৬৯ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ হাজার ৬০৫ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেয়া হয়।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭৬৯ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফেরদৌস সিদ্দিকী/এএম/আরআইপি