উপহারের শেষ প্রদর্শনী শাকিব খানের ‘নাকাব’

ফেরদৌস সিদ্দিকী ফেরদৌস সিদ্দিকী , নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:৩১ পিএম, ০৭ অক্টোবর ২০১৮

রাজশাহী নগরীর একমাত্র সিনেমা হল ‘উপহার’ বন্ধ হচ্ছে আগামী ১১ অক্টোবর। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়ীক মন্দায় চলছিল সিনেমা হলটি। একই কারণে একে একে রাজশাহীর অন্য সিনেমা হলগুলোও বন্ধ করে দেয় মালিক পক্ষ। কথা ছিল, নগরবাসীর বিনোদন নিশ্চিত করে নগর পুরাতন রাজশাহী সিটি ভবনের জায়গায় নির্মাণাধীন সিটি সেন্টারে হবে আধুনিক সিনেপ্লেক্স। ৩৬ মাসের এই প্রকল্পটির কাজ চলে নয় বছর ধরে।

তবে বাণিজ্যিক এই ভবনে সিনেপ্লক্সের স্পেস বরাদ্দ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ব্যবসায়ীক স্বার্থে এ ব্যাপারে পরিষ্কার করে কিছুই বলছে না ভবনটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান।

১৯৯১ সালের সরকারি হিসেবে জানা গেছে, রাজশাহী জেলায় কাগজে-কলমে প্রেক্ষাগৃহ ছিল ৫৫টি। তবে ওই সময় জেলায় ২৫টি প্রেক্ষাগৃহের অস্তিত্ব মেলে। উপহারসহ এখন জেলায় চালু রয়েছে মাত্র ছয়টি সিনেমা হল। সবমিলিয়ে নগরীতে উপহারসহ সিনেমা হলও ছিল ছয়টি। এক হাজার ৩৭৩ আসনের বর্ণালী সিনেমা হল ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহ। মন্দার কবলে পড়ে মালিকপক্ষ সেটি বিক্রি করে দেন ডেসটিনি গ্রুপের কাছে। সেখানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছিলো প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে আইনী জটিলতায় সেটি ঝুলে রয়েছে।

তবে ঠিকই গগনচুম্বি ভবন উঠেছে নগরীর এক সময়ের কল্পনা নাম পাল্টে উৎসব সিনেমা হল ভেঙে। ২০১০ সালের জুলাইয়েও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় এখানে। পরে তা ভেঙে স্বচ্ছ টাওয়ার নামে বহুতল ভবন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে রাজশাহী সিন্ডিকেট নামের এক প্রতিষ্ঠান।

একই দশা বরণ করতে হয়েছে নগরীর সবচেয়ে পুরনো অলোকা সিনেমা হল। ২০০৭ সালে সিনেমা হলটি ভেঙে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। এখানকার সাহিত্য ও নাট্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে বৃটিশ আমলে 'রাজা প্রমথনাথ টাউন হল' নির্মাণ করে ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব।

নব্বই দশকে এটি স্মৃতি সিনেমা হল নামে পরিচালিত হতো। ১৯১৯ সালের ২ এপ্রিল ভিক্টোরিয়া ক্লাবের কাছ থেকে হলটি কিনে নেয় রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। এরপর থেকে ভাড়ায় অলকা হল নামেই চলছিল এটি। আধুনিকায়নের অজুহাতে এই সিনেমা হলটিও ভেঙে ফেলা হয়। পরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে আধুনিক হল নির্মাণের কথা থাকলেও সেটি রাখেনি।

ব্যবসায়ীক মন্দার কারণে বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে নগরীর লিলি এবং রাজতিলক সিনেমা হল দুটিও। খুড়িয়ে চলছে জেলার দুর্গাপুরের নার্গিস, নওহাটার বাবুল, তানোরের আনন্দ, কেশরহাটের দিনান্ত, এবং বাগমারার শাপলা সিনেমা হল। কেবল উৎসব-পার্বনেই দর্শক পায় হলগুলো। বাকি সময় তালা ঝোলে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীক স্বার্থেই নির্মাণাধীন সিটি সেন্টারে সিনেপ্লেক্স রাখেনি রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের মালিকানাধীন এনা প্রোপার্টিজ। ২০০৯ সালের অক্টোবরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে দীর্ঘ নয় বছরেও নির্মাণ শেষ হয়নি।

নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী, এই ভবনটিতে থাকবে শপিং মল, ব্যাংক ও রেস্তোরাঁ ছাড়াও অত্যাধুনিক সিনেপ্লেক্স থাকবে। ঐসিহাসিক সোনাদীঘি সংরক্ষণসহ এখানে পায়ে হাটা পথ, আইটি লাইব্রেরি এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের কথা। সিটি সেন্টার নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও বাঁকি নির্মাণকাজের খবর নেই।

rajshahi

রোববার দুপুরে গিয়ে সেখানকার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনের কোথাও সিনেপ্লেক্সের জন্য স্পেস রাখা হয়নি। এ তথ্যের সত্যতা জানতে এনা প্রোপার্টিজের সিটি সেন্টার এবং কাদিরগঞ্জ দপ্তরে গিয়ে পাওয়া যায়নি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সারোয়ার জাহানকে।

পরে মুঠোফোনে তিনি দাবি করেন, নির্মাণাধীন ভবনের নবম তলায় সিনেপ্লেক্সের জন্য স্পেস রয়েছে। কবে সিটি সেন্টার চালু হবে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা।

তবে আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো প্রকল্পটি শেষ হবে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। আর নগরবাসীর বিনোদনের কথা মাথায় রেখেই চুক্তি অনুযায়ী ভবনে সিনেপ্লেক্স রাখার কথা জানান তিনিও।

এদিকে, বন্ধ হতে যাওয়া উপহার সিনেমা হলে শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া, সায়ন্তিকা অভিনীত 'নাকাব' সিনেমার প্রদর্শনী চলছে। ১১ অক্টোবর রাত ৯টায় শেষ বারের মতো প্রদর্শনী চলবে।

৩২ বছর ধরে হলে প্রহরীর দায়িত্বপালন করছেন জাহাঙ্গীর আলম। ৯ বছর ধরে দ্বাররক্ষক সোহাগ আলী। প্রথমে কথা বলতে রাজি না হলেও পরে জানান, এতে এখানে কর্মরত ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন। তবে কি কারণে হলটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সেটি জানাতে পারেননি কর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন কর্মী জানিয়েছেন, জমিসহ ১০ কোটি টাকায় হলটি বিক্রি করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। নতুন মালিক এখানে আর সিনেমা হল রাখবেন না। হল মালিক সাজিদ হোসেন চৌধুরী পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। কয়েক দফা চেষ্টা করেও তার মুঠোফোনে সংযোগ মেলেনি।

এদিকে, উপহার সিনেমা হল রক্ষায় রোববার বিকেলে নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন রাজশাহীর নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। রাজশাহী চলচ্চিত্র সংসদ এ আয়োজন করে।

মানববন্ধন চলাকালে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ডা. এফ এম এ জাহিদ। এতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি এবং রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. সাজ্জাদ বকুল, রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি চলচ্চিত্রনির্মাতা আহসান কবীর লিটন, বরেন্দ্র ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি সুলতানুল ইসলাম টিপু, ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও অভিনেতা মাহমুদ হোসেন মাসুদ প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. এফ এম এ জাহিদ বলেন, এভাবে সব সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হলে সিনেমার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটবে না। ঐতিহ্য হিসেবে হলেও একমাত্র সিনেমা হলটি বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ জন্য সমাজের দায়িত্ববান কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

ফেরদৌস সিদ্দিকী/এমএএস/জেআইএম