ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঠাকুরপাড়াবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর
প্রকাশিত: ১০:৪০ এএম, ১০ নভেম্বর ২০১৮

ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালের আজকের এ দিনে রংপুর সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া গ্রামে স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এক যুবক নিহত ও পুলিশসহ অন্তত ১৫জন আহত হন। এ সময় ওই এলাকায় ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ গঙ্গাচড়া ও কোতোয়ালি থানায় পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করে। মামলা দায়েরের এক বছর পেরিয়ে গেলেও দুই মামলার একটিরও প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। তবে দ্রুত এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সহিংসতার পর একবছর ধরে ওই এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প থাকলেও সেখানকার লোকজনের মাঝে আতঙ্ক কাটেনি এখনও। প্রায় ৯ মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে এসেছেন টিটু রায়।

সরেজমিনে ঠাকুরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, হামলার এক বছর পর বদলে গেছে ওই এলাকার চিত্র। সবকিছুই স্বাভাবিক। ভাঙচুরের শিকার ঘরবাড়ি ও মন্দিরগুলো সরকারি-বেসরকারি অনুদানে সংস্কার করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। দিন-রাত পুলিশ সদস্যরা ওই এলাকায় টহলরত অবস্থায় থাকেন।

কথা হয় ঠাকুরপাড়া এলাকার হামলার শিকার দিনেশ রায়ের স্ত্রী মিনতি রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত বছরের হামলার ঘটনায় আমরা সব হারিয়েছি। আমাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, ধান, চালসহ বাড়ির বিভিন্ন মালামাল লুটপাট করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অনুদানে আমাদের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ না হলেও আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি।

ঠাকুরপাড়ায় তাণ্ডবের ৪ দিন পর ১৪ নভেম্বর নীলফামারীর জলঢাকা থেকে টিটু রায়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। স্থানীয় এক ব্যক্তির দায়েরকৃত মামলায় তাকে গ্রেফতারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন টিটু রায়। প্রায় ৯ মাস কারাগারে বন্দী থাকার পর গত ৫ আগস্ট জামিনে ছাড়া পেয়েছেন তিনি।

টিটু রায় জানান, জামিনে মুক্ত হয়ে মা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়িতেই থাকছেন। কোথাও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অর্থাভাবে দিন কাটছে তার।

southeast

হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হরকলি ঠাকুরপাড়া শিব মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুপুর গোস্বামী বলেন, হামলা-ভাঙচুরের কারণে আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মন্দিরেরও সংস্কার করা হয়েছে। তবে আমাদের মনের ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পটি স্থায়ীকরণেরও দাবি জানান তিনি।

এলাকার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে দাবি করে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ একেএম আব্দুল মান্নান জানান, অস্থায়ী এই ক্যাম্পে দিনে-রাতে ১৩ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রেখেছি। এলাকায় কোনো ধরনের সমস্যা নেই।

এদিকে হামলার এক বছরেও দুই মামলার একটিরও প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এসব মামলায় গ্রেফতার হওয়া বেশিরভাগ আসামিই জামিনে রয়েছেন। তবে পুলিশের দাবি, সঠিক বিচার কাজের স্বার্থে ঘটনার ব্যাপক তদন্ত করা হচ্ছে। এ কারণেই প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গংগাচড়া মডেল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান মিজান জানান, ঠাকুরপাড়া হামলার ঘটনায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৫১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে রংপুর জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফজলার রহমানসহ ৪ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

রংপুর সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাবেদ আলী জানান, এ ঘটনায় ৮৩ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতারদের মধ্যে মাসুদ রানা নামে এক আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। দ্রুত এই মামলার প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।

এ ব্যাপারে রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) সাইফুর রহমান সাইফ বলেন, পুলিশ নিবিড়ভাবে মামলা তদন্ত করছে। সঠিক তদন্তের কারণে একটু সময় লাগছে। নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না তবে দ্রুত মামলা দু’টির প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হবে।

জিতু কবীর/এফএ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :