এমপি এনামুলের চেয়ে দ্বিগুণ সম্পদ স্ত্রীর

ফেরদৌস সিদ্দিকী ফেরদৌস সিদ্দিকী , নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০১:৩৮ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮

গত এক দশকে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের স্ত্রী তহুরা হকের সম্পদের পাহাড় জমেছে। সম্পদ বেড়েছে ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকেরও। নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনামুল হকের দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এর মধ্যে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে প্রথমবার নির্বাচিত হন এনামুল। আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন দশম সংসদ নির্বাচনে। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে নৌকার প্রাথী তিনি।

২০০৮ সালে এনামুল হকের বার্ষিক আয় ছিল ২০ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ৫০ লাখে। আর এবারের হলফনামায় এনামুল হক বার্ষিক আয় এক লাখ টাকা কমিয়ে দেখিয়েছেন ৪৯ লাখ।

হলফনানায় এনামুল হক তার স্ত্রী তহুরা হকের নির্দিষ্ট কোনো আয় দেখাননি। তবুও তহুরা হকের হাতে নগদে এক কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬৯ টাকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। আর নিজের নামে নগদ টাকার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯৮ দেখিয়েছেন তিনি।

২০০৮ সালে ৩ লাখ ৫৩ হাজার এবং ২০১৩ সালে ৫ লাখ টাকা নগদ দেখানো হয় তহুরা হকের নামে। অন্যদিকে নিজের নামে ২০০৮ সালে ৫৮ লাখ ১৯ হাজার এবং ২০১৩ সালে ১০ লাখ টাকা নগদ দেখান এনামুল হক।

এবার ব্যাংকে নিজের নামে ৭ লাখ ৮৭ হাজার ১১৪ টাকা এবং স্ত্রীর নামে ৪ লাখ ২ হাজার ৩২৫ টাকা জমা দেখিয়েছেন এনামুল। ২০১৩ সালে ৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকা নিজের এবং ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ স্ত্রীর নামে জমা দেখান। ২০০৮ সালে কেবল এনামুল হকের নামেই ব্যাংকে জমা ছিলো এক লাখ ৩১ হাজার টাকা। সেইবার তার স্ত্রীর নামে কোনো টাকা জমা দেখানো হয়নি।

এবার স্ত্রী তহুরা হকের মালিকানায় ৭ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার টাকার শেয়ার বিনিয়োগ দেখিয়েছেন এনামুল হক। যেখানে তার নিজের নামে শেয়ারে বিনিয়োগ এর প্রায় অর্ধেক ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

এর আগে স্ত্রীর নামে ২০০৮ সালে ২ কোটি ৮০ লাখ এবং ২০১৩ সালে ৮ কোটি ২ লাখ ১০ হাজার টাকা শেয়ারে বিনিয়োগ দেখানো হয়। অন্যদিকে নিজের নামে ২০০৮ সালে ৯ কোটি ২০ লাখ এবং ২০১৩ সালে নামে ৪ কোটি, ৮৬ লাখ, ৫০ হাজার টাকা শেয়ারে বিনিয়োগ দেখান এমপি এনামুল।

২০০৮ সালে দুই ছেলের নামে শেয়ারে বিনিয়োগ ছিল না। এরপর ২০১৩ ও ২০১৮ সালে নির্ভরশীলদের নামে শেয়ারে বিনিয়োগ দেখান ৩ কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

২০০৮ ও ২০১৩ সালে স্ত্রী তহুরা হকের নামে পোস্টাল, সেভিংস বা সঞ্চয়পত্রে কোনো বিনিয়োগ দেখাননি এনামুল। কিন্তু এবার এই খাতে স্ত্রীর নামে ৭৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৩৩ টাকা বিনিয়োগ দেখিয়েছেন। যদিও এই খাতে তার নিজের বিনিয়োগ স্ত্রীর প্রায় অর্থেক ৩৬ লাথ ১৮ হাজার ৯৫৬ টাকা। এর আগে ২০০৮ সালে ১৫ লাখ ৭ হাজার এবং ২০১৩ সাথে ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৩২৬ টাকা এই খাতে নিজের বিনিয়োগ দেখান এনামুল হক।

এনামুল হকের নামে রয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৯ টাকা অর্জনকালীন মূল্যের কৃষিজমি। কিন্তু কৃষিখাত থেকে কোনো আয় নেই তার। আর স্ত্রীর নামের ১৫ লাখ টাকা মূল্যের কৃষিজমির আয় দেখানো হয়নি। এর আগে ২০০৮ সালে ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার কৃষিজমি থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং ২০১৩ সালে এক কোটি ৫৪ লাাখ ৬৩ হাজার ২০০ টাকার কৃষিজমি থেকে ৫ লাখ টাকা আয় দেখান। ২০০৮ সালে না থাকলেও ২০১৩ সালে স্ত্রীর নামে কৃষিজমির পরিমাণ দেখান দেড় লাখ টাকার।

এবার তার নিজের নামে ৬৯ লাখ ৪৮ হাজার ২০৫ টাকার এবং স্ত্রীর নামে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার অকৃষিজমি দেখিয়েছেন এনামুল হক। এর আগে ২০১৩ সালেই একই পরিমাণ অকৃষিজমি দেখা তিনি। তবে ২০০৮ সালে নিজের নামে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার এবং স্ত্রীর নামে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার অকৃষি জমি দেখানো হয়।

২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিন মেয়াদেই নিজের নামে ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকার এবং স্ত্রীর নামে ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার আবাসিক ও বাণিজ্যক দালান দেখিয়েছেন। তাদের দুজনেরই বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নেই। ২০১৮ ও ২০১৩ সালে তার বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট/দোকান ভাড়া থেকে আয় দেখিয়েছেন ১৫ লাখ টাকা। ২০০৮ সালে এই খাতে তার কোনো আয় ছিলো না।

এছাড়া এনামুলের ব্যবসা থেকেই ২০১৮ সালে ২৪ লাখ টাকা এবং ২০১৩ সালে ২০ লাখ টাকা আয় ছিল । তবে ২০০৮ সালে এই খাতে কোনো আয় দেখানো হয়নি। সংসদ সদস্য হিসেবে ভাতা থেকে এবার ১৬ লাখ টাকা এবং ২০১৩ সালে ১ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন এনামুল। এর আগে ২০০৮ সালে বেতন থেকে আয় দেখান ২০ লাখ টাকা। সেইবার তার নির্ভরশীলদের আয় ছিল ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকা।

এমপি এনামুলের নামে এখন দুটি টয়োটা হার্ড জিপ। এর মধ্যে ৬৩ লাখ ৪২ হাজার ৮০২ টাকা মূল্যের (ঢাকা মেট্রো-গ-১৩-৪২-৪০) জিপটি ২০১৩ সালেও দেখানো হয়েছে। এবার যুক্ত হওয়া টয়োটা হার্ড জিপটির (ঢাকা মেট্রো গ-১৫-৩৮৫৫) মূল্য ৮৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬৯৯ টাকা।

স্ত্রীর মালিকানায় থাকা ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের টয়োটা জিপটি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৫৭৬৫) দেখিয়েছেন ২০১৩ সালেও। তবে ২০০৮ সালে হলফনামায় নিজের কোনো মাটরগাড়ি দেখাননি এনামুল হক। তবে ২০০৮ থেকেই বিয়ের দান হিসেবে নিজের ৪০ তোলা এবং স্ত্রীর নামে আরও ৪০ তোলা স্বর্ণালঙ্কার দেখিয়ে আসছেন এনামুল হক।

এবার এনামুল হক সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের পেশা দেখিয়েছেন। এর আগে ২০১৩ সালে নিজেকে এনা বিল্ডিং প্রোডাক্ট লিমিটেড, এনা এন্টারটেইনমেন্ট এবং সালেহা ইমারত এগ্রিকালচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে দেখান।

সেবার কৃষি ও মৎস্য ব্যবসা এবং বাড়ি ভাড়া ও জমি লিজ নেয়াও দেখান পেশা হিসেবে। এর আগে ২০০৮ সালে পেশা হিসেবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, হিমাগার ব্যবসা এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবসা দেখান আওয়ামী লীগের এই সংসদ সদস্য।

আরএআর/এমকেএইচ