মুহিতের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট
প্রকাশিত: ০৬:৪০ পিএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৯

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আলোকিত সিলেট গড়ার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল বন্দি স্থানান্তরের পর পুরাতন কারাগারটিকে উন্মুক্ত ‘গ্রিন পার্ক’ করার।

বন্দরবাজারের এ পুরাতন কারাগারকে নগরের ফুসফুস উল্লেখ করে মুহিত বলেছিলেন, বাদাগাটে নতুন কারাগার করে পুরাতন কারাগারকে উন্মুক্ত ‘গ্রিন পার্ক’ করে দেব। এখানে পায়ে হাঁটার ওয়াকওয়ে রাখা হবে। সকাল-বিকেল হাঁটাচলা ও বসার ব্যবস্থা থাকবে। ফলে সিলেটের পরিবেশ রক্ষা করবে এই ‘গ্রিন পার্ক’।

কিন্তু গত ১০ বছরেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেননি মুহিত। সর্বশেষ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘গ্রিন পার্ক’ করার গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়ায় অর্থমন্ত্রী মুহিতের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।

শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট নগরের বন্দরবাজার ও ধোপাদিঘীরপাড় এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা ২৩০ বছরের পুরনো সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে ‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. আব্দুল জলিল।

শুক্রবার সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বন্দি স্থানান্তরের পরপরই কারাগারের প্রধান ফটকে সাঁটানো হয় একটি ব্যানার। যাতে লেখা রয়েছে ‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২’।

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিল বলেন, পুরনো সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার যেমন আছে, তেমনই থাকছে। এখানে কার্যক্রম চলমান থাকবে। পুরনো কারাগারকে ‘গ্রিন পার্ক’ করার জন্য সদ্যসাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ডিও লেটার পাঠালেও প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মতি দেননি।

এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল জলিল বলেন, আপাতত সকল বন্দি বাদাঘাট কারাগারেই স্থানান্তর করা হয়েছে। সিলেটসহ দেশে ৫টি পুরাতন কারাগারে নতুন জনবল ও অফিস সরঞ্জামাদির অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব প্রেরণে একটি কমিটি করা হয়েছে। জনবল নিয়োগ দেয়ার পর পুরাতন কারাগারে বন্দি রাখা হবে। সিলেটে কেন্দ্রীয় কারাগারের পদ ৪৫৫টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৩৯৯ জন। জনবল নিয়োগের পর দুটি কারাগারই যথারীতি চলবে।

Shylet

তৎকালীন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনের স্বাক্ষরে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কারা অধিদফতর। ওই স্মারকে উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের বর্তমান সংখ্যাধিক্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী কারা বন্দিদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার মাধ্যমে কারাগারসমূহকে সংশোধনাগার করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ কারা-১ শাখার প্রজ্ঞাপনে সিলেট, ফেনী, মাদারীপুর, পিরোজপুর ও কিশোরগঞ্জ কারাগার নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ৫টি কারাগারে নতুন জনবল সৃজন ও অফিস সরঞ্জামাদির জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়।

জানা যায়, সদ্যবিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল বন্দি স্থানান্তরের পর পুরনো কারাগারটিকে ‘গ্রিন পার্ক’ করার। সিলেটের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পার্ক নিয়ে পরিকল্পনাও উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।

২০১৬ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকায় অর্থমন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সিলেটের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন- সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তৎকালীন বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ছাড়াও বৈঠকে সিলেট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সিলেট নগরীর ধোপাদিঘীরপাড়স্থ পুরনো সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের স্থলে একটি ‘গ্রিন পার্ক’ গড়ে তোলা হবে। সেখানে পুরনো ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপনা সংরক্ষণের মাধ্যমে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, কালচারাল সেন্টার, শিশুদের জন্য বিনোদনকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি। পরবর্তীতে সিলেট সফরে এসে ‘গ্রিন পার্ক’ গড়ে তোলার কথা জানিয়েছিলেন মুহিত। পার্কের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও লেটারও দিয়েছিলেন। তবে, সকল উদ্যোগ ভেস্তে যায়, কারা অধিদফতরের এক নির্দেশনায়।

এদিকে, পুরনো কারাগারের স্থলে ‘গ্রিন পার্ক’ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের দাবি ছিল, এখানে যেন একটি উন্মুক্ত সবুজ উদ্যান করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, পুরনো কারাগারের স্থলে উন্মুক্ত সবুজ উদ্যান এবং এর অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম করার দাবিতে মাস তিনেক আগে সিলেটের রাজনৈতিক ও পেশাজীবী এবং প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি সেমিনার হয়। সেমিনারে বেশ কিছু সুপারিশ উঠে আসে, কিভাবে সবুজ পার্ক করে নগরের পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে মানুষের উপকারে এটিকে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু এখন দেখছি, আরও একটি কারাগার বাড়ানো হলো। নগরের মাঝখানে বিষফোড়া হিসেবে রেখে দেয়া হলো সেই পুরনো কারাগার।

ছামির মাহমুদ/এএম/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :