চট্টগ্রাম গণহত্যা : বিচার শেষ হয়নি তিন দশকেও

আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১১:২১ এএম, ২৪ জানুয়ারি ২০১৯

স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগের সমাবেশের আগে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার বিচার শেষ হয়নি তিন দশকেও। ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিত পাওয়া এই ঘটনার ৩১ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ।

এরশাদ সরকারের শেষ দিকে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নগরীর লালদীঘি ময়দানে এক জনসভায় যাওয়ার পথে তার গাড়িবহরে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হন।

গত তিন দশকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন সাক্ষী, দুই আসামি চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদা ও পুলিশ কনস্টেবল বশির উদ্দিন, মামলার বাদী আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা এবং তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি আব্দুল কাদের মারা গেছেন। এ ছাড়া আসামিদের একজন পলাতক আছেন এবং চারজন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন।

jagonews

২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে মামলাটির বিচার চলছে। ওই সময় ২০১৭ সালের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা বলা হলেও এরপর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি বন্দরনগরীর লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভা ছিল। ওইদিন বেলা ১টার দিকে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাকটি আদালত ভবনের দিকে আসার সময় গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ওইদিন পুলিশের গুলিতে মোট ২৪ জন মারা যান।

নিহতরা হলেন- হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবারট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডিকে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বিকে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, মসর দত্ত, হাশেম মিয়া, মো. কাশেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও মো. শাহাদাত।

jagonews

গুলিবর্ষণের পর আইনজীবীরা মানববেষ্টনী তৈরির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে রক্ষা করে তাকে আইনজীবী সমিতি ভবনে নিয়ে গিয়েছিলেন। গুলিতে নিহতদের কারও লাশ পরিবারকে নিতে দেয়নি তৎকালীন সরকার। হিন্দু-মুসলিম নির্বিচারে সবাইকে বলুয়ার দীঘি শ্মশানে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

স্বৈরাচার এরশাদের সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। দুই-দফা তদন্ত শেষে দেয়া অভিযোগপত্রে মামলার আট আসামি হলেন- চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা, কোতোয়ালি অঞ্চলের পেট্রোল ইনসপেক্টর জে সি মণ্ডল, কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মুশফিকুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন।

১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ২০ বছরে এ মামলায় সাক্ষ্য দেন ২১ জন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পরে মাত্র এক বছরে সাক্ষ্যগ্রহণ হয় ১৩ জনের। এরপর ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

jagonews

২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি মামলাটি বিচারের জন্য আসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে। বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আসার পর ১১ জন সাক্ষ্য দেন। ২০১৬ সালের ২৬ জুন সাক্ষ্য দেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগ নেতা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘গত বছরের জুলাই মাসে মামলার প্রধান আসামি সিএমপির তৎকালীন কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা মারা গেছেন বলে তার আইনজীবী প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশে সিএমপির বিশেষ শাখা থেকে সত্যতা তদন্ত করে ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়।এ মামলার ১৬৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের সাক্ষ্যগ্রহণের বাকি রয়েছে। তাদের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে এই বছরের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’

ওই দিন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন নগরের লামাবাজার এ এস পৌর কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র হাসান মুরাদ। তার বড় ভাই আবুল মনজুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘২৪ জানুয়ারির আগে-পরে সাংবাদিকরা আসে, তাদের বিষয়ে জানতে চায়। আর আমাদের পরিবার তাদের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু বিচার হয় না। এটা অনেক কষ্টের।’

এমবিআর/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :