সমঝোতার জন্য দুই পক্ষকে ডেকে মারা গেলেন ওসি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ১০:০৭ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা বিলচান্দক গ্রামে গত দুইদিন ধরে দুই পক্ষের বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষ ভাঙচুর ও লুটপাট চলছে।

সোমবার দিনভর সেখানে এক পক্ষ অপর পক্ষের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। দুইদিন ধরে ফরিদপুর থানা পুলিশের ওসি ওবায়দুর রহমান পুলিশ ফোর্স নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। এই বিবাদ নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ওসি সোমবার ওই এলাকায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার মাথায় পানি ঢালাসহ প্রাথমিক সেবা দেয়া হয়।

এরপর এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে কমিউনিটি পুলিশিং, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে মঙ্গলবার সেখানে একটি বৈঠকের আয়োজন করেন ওসি। কিন্তু মীমাংসা বৈঠকের আগেই বিকেলে থানায় কর্তব্যরত অবস্থায় ওসি ওবায়দুর রহমান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

মৃত্যুর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ওসি ওবায়দুর রহমান জানিয়েছিলেন, এলাকার রহমত প্রামাণিক ও আনসার আলী আকন্দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিবাদ চলে আসছে। একপর্যায়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

এর জের ধরে রহমত প্রামাণিকের সমর্থক এনামুল হকের নেতৃত্বে ২০-২৫ ব্যক্তি লাঠি-সোঁটা নিয়ে রাত ৯টার দিকে প্রতি পক্ষ ইউপি সদস্য বাবুল আক্তার, আনসার আকন্দ, শামীম রেজা, এলাহী সরকার, রুহুল আমিন, রবিউল করিম, এনামুল হক ও মুক্তিযোদ্ধা রহিম মন্ডলের বাড়িতে আক্রমণ করে। এ সময় দরজা-জানালা, টিভি, ফ্রিজ, আসবাবপত্র ভাঙচুর ও লুটপাট করে তারা।

এতে ২০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় ইউপি সদস্য বাবুল আক্তার বাদী হয়ে ৬৮ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ মামলার আসামি রহমত প্রাং (৬০), আব্দুল মালেক প্রাং (৩০), আলাউদ্দিন আলী (৪৫) ও মুকুল হোসেনকে (৩২) গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।

রহমত গংরা গতকাল পাবনা আদালতে জামিন নিতে গেলে বাবুল আক্তার ও আনসার আকন্দের লোকজন সকাল ১০টার সময় রহমত আলীর পক্ষের শফিকুল, আলম হোসেন ও নান্নুর বাড়ি-ঘরসহ ১০-১২টি বাড়ি ভাঙচুর করে।

খবর পেয়ে রহমত আলীর লোকজন সোমবার বিকেল ৫টার দিকে গ্রামের আত্মীয়-স্বজনসহ ৫০-৬০ জন লোক লাঠি-সোঁটা নিয়ে গ্রামের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লোকজনকে মারপিট করে। বাবুল আক্তারের পক্ষের শতাধিক নারী তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে অন্য গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেয়।

ওসি ওবায়দুর রহমান আরও জানিয়েছিলেন, এলাকায় একবার মীমাংসা করে দিয়ে আসার পর আবারও তারা বিবাদে জড়ান। এ অবস্থায় এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। স্থায়ী মীমাংসার জন্য মঙ্গলবার কমিউনিটি পুলিশিং, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সেখানে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

কিন্তু মীমাংসা বৈঠকের আগেই মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে থানায় কর্তব্যরত অবস্থায় ওসি ওবায়দুর রহমান হৃযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। তবে এতেও থেমে নেই দুই পক্ষের সংঘর্ষ।

ওসি ওবায়দুর রহমান গত বছরের ২৮ অক্টোবর ফরিদপুর থানায় যোগদান করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫২ বছর। তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলে রেখে যান।

পুলিশের চাটমোহর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএএম ফজল ই খুদা বলেন, সোমবার বিলচান্দক গ্রামে বিবদমান দুই পক্ষের মারামারি ঠেকাতে গিয়ে ওসি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পুলিশ মোতায়েনের পর মঙ্গলবার সেখানে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ায় ওসি আর সেখানে যাননি। দুই পক্ষকে বৈঠকের জন্য ডাকা হয়।

এরই মধ্যে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে থানায় কর্তব্যরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে সহকর্মীরা ওসিকে ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মকছুদপুর উপজেলায়। সন্ধ্যায় ওসির মরদেহ পাবনা পুলিশ লাইনে আনা হয়েছে। সেখানে রাতে প্রথম জানাজা শেষে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় গ্রামে বাড়িতে পাঠানো হবে বলেও জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএএম ফজল ই খুদা।

একে জামান/এএম/জেআইএম