সোনাইমুড়ীর দুই ভাই রাজু-রানার বাড়িতে চলছে শোক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী
প্রকাশিত: ০৮:৫০ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নাটেশ্বর ইউনিয়নের ঘোষকামতা গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে মাহাবুবুর রহমান রাজু (২৮)। কদিন আগে ২৮ জানুয়ারি পাশের গ্রামের আফরোজা সুলতানা স্মৃতির সঙ্গে শুভ পরিণয়ে জড়ান তিনি। মেহেদি রঙে সাজানো নববধূর হাত ধরে নতুন জীবনে পা রেখেছিলেন রাজু। দু’জোড়া হাত এক করে নতুন বর্ণিল জীবনের প্রত্যাশায় বেঁধেছিল ঘর। হয়তো ফুল শয্যার রাতেই শপথ নিয়েছিলেন দুজন মিলে সাজাবে স্বপ্নের ভবিষ্যত। কিন্তু দুজন মিলে যে স্বপ্ন দেখেছিল তা শুধুই স্বপ্ন রয়ে গেল। হাতের মেহেদি রঙ শুকাতে না শুকাতে ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিভিয়ে দিল রাজুর স্বপ্নের আলোকিত বাতি। বিধবা হলেন স্মৃতি।

রাজুর গ্রামের বাড়ির এক চাচা বাবর হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে জানান, অগ্নিকাণ্ডে রাজুর সঙ্গে জীবন দিয়েছে তার বড় ভাই মো. মাসুদ রানাও (৩৬)। রানা ও রাজু এক সঙ্গে চকবাজারে প্রসাদনী তৈরির কাচা মাল ‘পাউডার’ ও রানা মোবাইল-ফ্যাক্সের দোকান করতেন। তার বাবা সাহেব আলী প্রায় ৪৫ বছর পূর্বে ঢাকায় পাড়ি জমান। সাহেব উল্যা তার ছোট ভাই আবদুর রহিমকে ঢাকায় নিয়ে যান। তিনি চকবাজারে ব্যবসা করার সুবাধে রানা ও রাজুর জন্মও ঢাকায়।

বাবার সঙ্গে ঢাকায় ভাড়া বাসায় থেকে বড় হয় তারা। যার কারণে সেখানে নিজেদের ব্যবসায় বসে পড়েন দুই ভাই। বড় ভাই রানা চার বছর বয়সী এক সন্তানের জনক। তার স্ত্রী বর্তমানে গর্ভবতীও। রাজুও মাত্র বিয়ে করলো। এখনও এক মাস পূর্ণ হয়নি। নতুন বধূর গ্রামের বাড়ি একই এলাকায় হলেও তারাও থাকেন ঢাকায়। বিয়ের পর কথা ছিল বাড়ি আসবেন। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। এখন আসবে শুধু তার মরদেহ।

তিনি জানান, গ্রামের বাড়িতে বছরে দু-একবার আসতেন পরিবারের সদস্যরা। কিছুদিন পূর্বে গ্রামে পুরাতন বাড়ির পাশের একটি জমিতে ভিটে নির্মাণ করেছে তারা। চলতি বছর সে ভিটেতে বাড়ি করারও কথা ছিল। কিন্তু আজ সবই শেষ হয়ে গেল পরিবারটির।

সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, নিহত দুই সহোদরের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। ফুফু, জেঠি ও চাচিদের কান্নায় পুরো বাড়ির বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। আশপাশের শত শত মানুষ খোঁজ-খবর নিতে আসছে বাড়িতে।

বাড়ির লোকজন জানান, বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যেই দুই ভাইয়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আসার কথা রয়েছে। এ জন্য পারিবারিক কবরস্থানও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। বাড়িতে মরদেহ দুটি আনলে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানেই তাদের দাফন করা হবে।

এ মর্মান্তিক ট্রাজেডিতে গোটা নাটেশ্বর ইউনিয়ন স্তব্ধ। শুধু রানা ও রাজু নয় নাটেশ্বর ইউনিয়নের আরও ছয় জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন, ওই ইউনিয়নের পশ্চিম নাটেশ্বর গ্রামের মিনহাজী বাড়ির মৃত ভুলু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আলী হোসেন (৬৫), নাটেশ্বর গ্রামের সৈয়দ আহমদের ছেলে হেলাল উদ্দিন, মির্জা নগর গ্রামের আবদুর রহিম বিএসসির ছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু (৩৮), মমিন উল্যার ছেলে সাহাদাত হোসেন হিরা (৩২), মৃত গাউছ আলমের ছেলে নাছির উদ্দিন (৩২) ও পার্শ্ববর্তী বারোগা ইউনিয়নের দৈলতপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আনোয়ার। এছাড়া বেগমগঞ্জ উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মুজাহিদপুর গ্রামের কামাল হোসেন।

স্থানীয়রা জানান, চকবাজারে ব্যবসা বা চাকরি করেন উপজেলার বজরা, নাটেশ্বর ও বারোগাঁও ইউনিয়নের কয়েক হাজার লোক। তবে সবচেয়ে বেশী নাটেশ্বর ইউনিয়নের লোকজন ব্যবসা করেন পাশাপাশি সপরিবারে থাকেন চকবাজার, ইসলামবাগ, লালবাগসহ আশপাশে। তাদের প্রধান ব্যবসা হলো প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি ও এর দানা ব্যবসা। ছোট ছোট কারখানা খুলে নিজেরা স্বাবলম্বীসহ এলাকার অনেক বেকার যুবকের কর্মস্থান সৃষ্টি করেছেন।

ঢাকায় অবস্থানরহ চকবাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাটেশ্বরের ২০ জনেরও বেশি লোক মৃত্যুবরণ করেছে। যদিও এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে মোট ৮ জনের নাম ও আংশিক পরিচয় মিলেছে।

নাটেশ্বর ইউনিয়ন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া জাগো নিউজকে জানান, এ মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো নাটেশ্বর আজ শোকাহত। একসঙ্গে এতগুলোর প্রাণ চলে যাবে কেউই ভাবতে পারেনি। তাই আজ মহান আন্তর্জাতিক ভাষা ও শহীদ দিবসে আমার সকলেই তাদের আত্মার জন্য শান্তি কামনা করেছি। প্রত্যেক পরিবার যেন এ শোককে শক্তিতে পরিণত করে এজন্য দোয়া করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার টিনা পালকে ফোন দিলে তিনি ছুটিতে রয়েছেন বলে জানান। ফলে কোনো তথ্য দিতে পারেননি ইউএনও। তবে সোনাইমুড়ী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সামাদ জানান, অফিসিয়ালি তাদেরকে কেউ এখনও কিছু জানায়নি। তবে তিনি নাটেশ্বর ইউনিয়ন ও বারোগাঁও ইউনিয়নে পুলিশ পাঠিয়ে কিছু খোঁজখবর নিয়েছেন। ইতোমধ্যে তার কাছে ৬-৭ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে।

মিজানুর রহমান/এমএএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :