ডাক্তার বলছেন ধর্ষিত, এসআই বলছেন প্রমাণ নেই

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৮:৪৩ পিএম, ১৮ মার্চ ২০১৯
ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার সুমন

শিশুটির বয়স সাত বছর। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। এই বয়সেই ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। পাশবিক নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখন কাউকে দেখলেই আঁতকে ওঠে। অপরিচিত কাউকে দেখলেই মায়ের আঁচল তলে লুকিয়ে যায়। সেই সঙ্গে কান্না শুরু করে। কিছুতেই থামে না তার কান্না। মা ছাড়া কাউকে চেনে না শিশুটি।

গত রোববার (১৩ মার্চ) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শিশুটিকে ধর্ষণ করে সুমন (২০) নামে এক যুবক। পাশবিক নির্যাতনের পর থেকে শিশুটি কাউকে চেনে না। কিছুক্ষণ পর পর কান্না শুরু করে। আত্মীয়-স্বজন কাউকে দেখলেই লুকিয়ে যায় শিশুটি। বর্তমানে শিশুটিকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় মা।

শিশুটির মা জানান, নির্যাতনের পর থেকে শিশুটি কাউকে চেনে না। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চিৎকার শুরু করে। সেই সঙ্গে থরথর করে কাঁপে। কাছে গেলে কান্না শুরু করে। কোনোভাবেই তার কান্না থামানো যায় না।

শিশুটির মা বলেন, ‘এ ঘটনার পর ফতুল্লা মডেল থানায় ধর্ষণের মামলা করি আমি। কিন্তু ধর্ষণের মামলা বদলে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা রুজু করে পুলিশ। কীজন্য পুলিশ এমন কাজটি করেছে তা আমি জানি না।’

তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শুভ আহম্মেদ বলেছেন, ‘আমি মামলার এজাহার বদল করিনি, বাদী নিজেই এজাহার সংশোধন করে দিয়েছেন। এখানে আমার কোনো হাত নেই।’

পাশাপাশি এসআই শুভ আহম্মেদ বলেছেন, মামলার পর নির্যাতনের শিকার শিশুটির বক্তব্য নিতে গেলে কিছুই জানায়নি শিশুটি। তবে শিশুটি কাউকে চেনে না বিষয়টি আমি লক্ষ্য করিনি।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ওই শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রমাণ পেয়েছি আমরা।

এ নিয়ে স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, চিকিৎসকরা যেখানে বলেছেন ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেখানে পুলিশের এসআই কীভাবে বলছেন শিশুটি জানিয়েছে ধর্ষণ হয়নি। আসলে কাকে বাঁচানোর জন্য এমন চালাকির আশ্রয় নিয়েছেন এসআই।

এ বিষয়ে মামলার বাদী শিশুটির মা বলেন, মূলত আসামিকে বাঁচানোর জন্যই আমাকে না জানিয়ে মামলার এজাহার বদলে দিয়েছেন এসআই শুভ। এ অবস্থায় শিশু ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছি আমরা।

শিশুটির মা আরও বলেন, নির্যাতনের শিকার মেয়েটা চারদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অথচ পুলিশ বলছে প্রাথমিক চিকিৎসার কথা। পুলিশ ধর্ষকের পক্ষ নিলে আমরা কার কাছে যাব?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শুভ আহম্মেদ বলেন, মেয়ের মায়ের কথায় তো আর ধর্ষণ লেখা যায় না, মেয়ে বলছে ওর কিছু হয়নি। কোনো প্রমাণ নেই। এজন্য ধর্ষণচেষ্টা লেখা হয়েছে। এরই মধ্যে শুক্রবার সকালে আসামি সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বাদীকে না জানিয়ে মামলার এজাহার বদলে দেয়ার প্রসঙ্গে এসআই শুভ বলেন, ‘আমি এজাহার বদলাইনি। বাদী নিজেই পরবর্তীতে এটি সংশোধন করেছেন। সেখানে তার স্বাক্ষরও আছে।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কথামতো সাদা কাগজসহ বেশকিছু কাগজে স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করে মামলার বাদী বলেন, পড়াশোনা না জানায় কখন কোথায় স্বাক্ষর করেছি, সেটা আমি জানি না। তবে এসআই যা বলেছেন, আমি তাই করেছি।

ধর্ষণের শিকার শিশুটির বড় ভাই বলেন, মামলার পর থেকে আমাদের কোনো সহযোগিতা করেনি পুলিশ। উল্টো মামলার এজাহার বদলে ফেলেছেন এসআই শুভ। বৃহস্পতিবার বিকেলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামির অবস্থান জানানো হলেও গ্রেফতার করেননি। উল্টো বলেছেন, আসামিকে যেন চোখে চোখে রাখা হয়। পরবর্তীতে আমি নিজেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানা পুলিশের সহায়তায় আসামিকে ধরে ফতুল্লা থানা পুলিশে সোপর্দ করি।

শিশুটির ভাইয়ের অভিযোগ, আসামি ধরতে যাওয়ার সময় পুলিশের ব্যবহৃত গাড়ির তেল খরচ বাবদ টাকা দিতে হয়েছে আমাকে। ঘটনার পর থেকে আসামি পক্ষ এলাকার প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বিষয়টির মীমাংসার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) জাসমিন আহমেদ বলেন, বাদীকে না জানিয়ে মামলার এজাহার পরিবর্তন করা আইনবিরোধী। এর মাধ্যমে আসামিকে বাঁচানোর চেষ্টার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শিশুটির পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ যাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন মহিলা পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি লক্ষ্মী চক্রবর্তী।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পপি রানী সরকার বলেন, এসআইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগে আমরা শঙ্কিত। এমন ঘটনা ধর্ষকদের উৎসাহিত করবে। নির্যাতিতরা আইনের প্রতি আস্থা হারাবে।

জানতে চাইলে ফতুল্লা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি যদি মামলার এজাহার বদলে দেন তবে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) ইমরান মেহেদী বলেন, দুই রকমের এজাহারের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শুভ আহম্মেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মো. শাহাদাত হোসেন/এএম/জেআইএম