সেই রাতের নায়ক তিনি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নেত্রকোণা
প্রকাশিত: ১২:২১ পিএম, ২৫ মার্চ ২০১৯

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারী শক্তিটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা। সেদিন তারা নিজেদের নির্ঘাত মৃত্যুর কথা জেনেও থ্রি নট থ্রি দিয়ে পাকিস্তানি ট্যাংক, কামান, গোলাবারুদের বিরুদ্ধে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন।

রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৩৭ ট্রাক আর্মি ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরের দিকে বের হয়। পুলিশের ওয়ারলেসের মাধ্যমে বিষয়টি জানায় ফার্মগেটে টহলরত পুলিশের একটি টিম। সেইসব ট্রাকের একটি অংশ আঘাত হানে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে।

সেই রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ওয়ার্লেস বেইজ স্টেশনের অপারেটর মো. শাহজাহান মিয়া অসীম সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজ উদ্যোগে তৎকালীন ১৯টি জেলা ও ৩২টি সাব-ডিভিশনের পুলিশ স্টেশনে পাক আর্মির রাজারবাগে আক্রমণের কথা জানিয়ে দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ সংঘটিত হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রেফতারের আগে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর ১২টা ৩০/৩৫ মিনিটে তিনি ইপিআরের একটি ছোট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ছিল (This may be my last massage, from to-day Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you fight be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expedited form the soil of Bangladesh and final victory is achieved.)

অপারেশন সার্চলাইট শুরু হলো রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইপিআর সদর দফতরে। তখন সর্বপ্রথম স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা সরকারি বাহিনী পুলিশের ওপর সর্বপ্রথম আঘাতটি আসে। সেদিন দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্য শহীদ হন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে। আর পুলিশই সর্বপ্রথম অস্ত্র হাতে তুলে নেয় বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারী হিসেবে ২০১১ সালে বাংলাদেশ পুলিশকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত করা হয়। সেই পুরস্কারের সময় শাহজাহানের এই অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়।

শাহজানের এই বার্তাটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে প্রথম প্রতিরোধী বার্তা। দেশের ১৯টি জেলায় পুলিশ স্টেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পাকিস্তানি আর্মিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। আপনারা অস্ত্র হাতে তুলে নেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এগিয়ে আসুন।

Picture-Netrakona

এটিই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে প্রথম প্রতিরোধী বার্তা। এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম বার্তাটি প্রেরণ করেন তখনকার পুলিশের সদস্য মো. শাহজাহান। তিনি ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিরও বিশেষ বিশেষ অংশ ওয়ার্লেসের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন।

এই মহান মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বাট্টা গ্রামের বাড়িতে সাক্ষাৎ হয়। তার জীবনে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব থেকে বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের নানা কথা তুলে ধরেন। চোখের পানিও ফেললেন রাজারবাগ পুলিশ ওয়ার্লেস বেইজ স্টেশনে সেই ২৫ মার্চ ভয়াল রাতের কাহিনীর স্মৃতিচারণে।

সেই রাতে পুলিশের অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে মুক্তিপাগল পুলিশ সদস্যরা মরণপণ লড়াইয়ে নামেন পাকিস্তানি আর্মিদের বিরুদ্ধে। সেদিন পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে রাত আড়াইটা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। বাংলাদেশিদের একটি গুলির জবাবে পাক হানাদাররা নিক্ষেপ করে হাজার হাজার গুলি। পুলিশের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি মেসেজটি পাঠিয়েই চলে আসেন যুদ্ধক্ষেত্রে। হাতে তুলে নেন অস্ত্র। পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর এই যুদ্ধে এক সময় হায়েনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সেদিন রাতে দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্য দেশমাতৃকার জন্যে পাকিস্তানিদের হাতে শহীদ হন। ৭/৮টি ট্রাকে করে সেসব শহীদদের লাশ উধাও করে ফেলে পাক সেনারা।

ভোরে যুদ্ধ শেষে পানির ট্যাংকির নিচ থেকে মো. শাহজাহান মিয়াসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে পাক আর্মিরা। ২৬ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত বন্দী থাকা অবস্থায় নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ২৯ মার্চ বিকেলে পুলিশ মিল ব্যারাক থেকে পালিয়ে বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। শূন্য পকেট আরেক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে বাড়ির পথে রওনা দেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নির্যাতিত শরীর নিয়ে বাড়ি পৌঁছেন তিনি। সেখান থেকে ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দেন ভারতে। সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধের ১১নং সেক্টরে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সাহসী এ যোদ্ধা। চান্দুয়ায়, বিজয়পুর, ধর্মপাশাসহ বড় বড় পাঁচটি যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ৭ ডিসেম্বর বিজয়পুর যুদ্ধজয়ে ফেরার পথে বাম পায়ে পাকিস্তানি সেনাদের পুঁতে রাখা মাইনের স্প্লিন্টার বিদ্ধ হন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিদান এবং তাদের মধ্যে আত্মত্যাগের প্রেরণা সৃষ্টির লক্ষ্যে বীরত্বসূচক খেতাব প্রদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী মে মাসের প্রথমদিকে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন করেন। ১৬ মে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে বীরত্বসূচক খেতাবের প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। এ পরিকল্পে চার পর্যায়ের খেতাব প্রদানের বিধান ছিল: (ক) সর্বোচ্চ পদ, (খ) উচ্চ পদ, (গ) প্রশংসনীয় পদ, (ঘ) বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্র।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সভায় বীরত্বসূচক খেতাবের নতুন নামকরণ হয়: সর্বোচ্চ পদমর্যাদার খেতাব হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ (৭ জন), উচ্চ পদমর্যাদার খেতাব হচ্ছে বীর উত্তম (৬৮ জন), প্রশংসনীয় পদমর্যাদার খেতাব বীর বিক্রম (১৭৫ জন) এবং বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্রের খেতাব দেয়া হয় বীর প্রতীক (৪২৬ জন) নামে।

১৯৭২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বীরত্বসূচক খেতাবের জন্য নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ২৬ মার্চ পূর্বের ৪৩ জনসহ মোট ৫৪৬ জন মুক্তিযোদ্ধা খেতাবের জন্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়কে বিভিন্ন ইউনিট, সেক্টর, ব্রিগেড থেকে পাওয়া খেতাবের জন্য সুপারিশসমূহ এয়ার ভাইস মার্শাল এ. কে খন্দকারের নেতৃত্বে একটি কমিটি দ্বারা নীরিক্ষা করা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খেতাব তালিকায় স্বাক্ষর করেন।

মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ ৭ জন, বীর উত্তম ৬৯ জন, বীর প্রতীক ৪২৬ ও বীর বিক্রম ১৭৫ জন নির্দিষ্ট হন। বীর উত্তম ৬৮ জনের মধ্যে একমাত্র কাদের সিদ্দিকী ছাড়া বাকিরা নৌ, বিমান, সেনাবাহিনীর সদস্য। বীর প্রতীকের ৪২৬ জনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ১১৯ (সাধারণ মানুষ) মুজাহিদ ৯ জনসহ ১২৮ জন ব্যতীত বাকিরা সবাই বিমান, সেনা ও নৌবাহিনীর। আর বীর বিক্রমের ১৭৫ জনের মধ্যে নৌ ১০, গণবাহিনীর ৩৪, বিমানের ১ ও সেনার ১৩০ জন।

মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদানের জন্যে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১১ প্রদান করা হয়েছে। সেসময় যেসব পুলিশদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে তাদের মধ্যে মো. শাহজাহান অন্যতম। তিনিই প্রথম মেসেজ প্রেরক। সম্মুখযোদ্ধা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তাই কার্যক্রম পর্যালোচনা করে মো. শাহজাহান মিয়াকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হোক। মূল্যায়নের খতিয়ানে মুক্তিযোদ্ধো বিষয়ক মন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টিতে আসুক এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম,জীবন সায়াহ্নে এসে এটাই চান বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান।

কামাল হোসাইন/এফএ/পিআর