পাগলের মতো সবার বাড়ি বাড়ি ছুটেছি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৭:০৫ পিএম, ২৫ মার্চ ২০১৯

১৯৭১ সাল। চারিদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা। একের পর এক পুড়ে চলেছে শ্যামল বাঙলার শহর গ্রাম। হাট-বাজার দোকান-পাট। দেশজুড়ে পাক বাহিনীর গণহত্যার বিভীষিকা। লাখে লাখে মরছে বাঙালি। দেশব্যাপী উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা।

এমন দমবন্ধ পরিস্থিতিতে এক রাজমিস্ত্রির বউ মাহমুদা বেগম ছুটে ফিরতেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। চাল, ডাল, তেল, নুন, তরকারি, আনাজপাতি যা কিছু মিলত সেগুলো রান্না করতেন মাহমুদা। নিজের সন্তানের মতো রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে সেসব রান্না খাবার তুলে দিতেন। কোনো কোনো দিন রেঁধে খাওয়ানোর মতো কিছুই থাকত না। সেদিন ছোলা মসুরি কিংবা গম ভেজে দিতেন। মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের পরনের পোশাক ধুয়ে রোদে শুকিয়ে দিতেন। পাগলের মতো সবার বাড়ি বাড়ি ছুটেছেন তিনি।

বয়সের ভারে এখন বেঁকে পড়েছেন মাহমুদা বেগম। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। কমে এসেছে দৃষ্টিশক্তিও। কিন্তু অশীতিপর এই নারী এখনো স্মরণ করতে পারেন একাত্তরের সেই দিনগুলি। কোনোরকম এদিক-সেদিক হয় না তার।

সোমবার সকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে ফিরে যান মাহমুদা বেগম। তরুণ প্রজন্মের কাছে সেই দিনের গল্প বলেন অবলিলায়। এই গল্প বলার ও শোনার সুযোগ করে দিয়েছিল যশোরের মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার। সঙ্গে ছিল জনউদ্যোগ যশোর।

শহরের সদর হাসপাতাল সংলগ্ন ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কার্যালয়ে ‘স্মৃতিচারণ ১৯৭১’ অনুষ্ঠানে তিনিসহ আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন তাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্প বলেন। বাস্তব জীবনের সেই গল্পের ভেতরে মনের অজান্তে ঢুকে যায় স্কুল কলেজ পড়ুয়া এই প্রজন্ম। অন্তত গল্প কথনের সময় তরুণদের যে পিনপতন নীরবতা, তাদের গল্প শোনার বিভোরতা সেটাই বলে দেয়।

নারী মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদা বেগমের সঙ্গে যেন সবাই চলে যেতে থাকে সেই অগ্নিগর্ভ একাত্তরে। তখন মে মাসের মাঝামাঝি হবে হয়তো। রবিউল আলম ও কালু নামে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আসেন আমার বাড়িতে। তখন ভর দুপুর। সেখানে দুপুরের খাবার সারেন তারা। তাদের সঙ্গে আলাপ করে যুদ্ধে যোগ দেয় আমার স্বামী খোরশেদ আলী। সেই সুযোগটি নিই আমি। আমিও প্রশিক্ষণ নিই। অংশ নিই মুক্তিযুদ্ধে। গ্রেনেড ছোড়া ও রাইফেল চালানো শিখি। মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেব বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সংগ্রহ শুরু করি। পাগলি সেজে, কখনো বউ সেজে আবার কখনো ভিক্ষুক ও ফেরিওয়ালা সেজে ইনফরমারের কাজ করতাম আমি।

একাত্তরের স্মৃতিচারণের একপর্যায়ে মাহমুদা বেগম বলেন, একবার পাকসেনাদের আত্মসর্মপণের খবর পাই। এটি জানার পর গোপনে দা নিয়ে বের হই। আত্মসমর্পণ করার স্থলে গিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে কুপিয়ে হত্যা করি এক পাকসেনাকে।

আশির বেশি বয়সী এই নারী মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতার কথা যশোর সদরের কাশিমপুরের মধুগ্রামসহ আশপাশের গ্রামে কিংবদন্তির কাহিনীর মতো মানুষের মুখে মুখে।

এদিকে, স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে একাত্তরের গল্প করেন আরেক মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, একাত্তর সালের কোনো একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এ সময় দেখেন, তার গ্রামের বাড়ি দেয়াড়ার পাশের গ্রাম ফরিদপুরে পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। গ্রামটিতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ৬৮ জনের বেশি মানুষ হত্যা করে পাকবাহিনী। এ ঘটনার পরপরই তিনি কাশিপুর সীমান্ত হয়ে ভারতের বয়রা রওনা হন। সাত্তার, খয়রাত হোসেন ও আব্দুল মান্নানসহ ১৭ জনের একটি দল ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর প্রশিক্ষণের ১০ দিনের মাথায় ২৯ মে সাতক্ষীরার ভোমরায় নতুন মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। এ যুদ্ধে মুক্তিসেনারা জীবিত অবস্থায় একজন পাকসেনাকে ধরে ফেলে। উদ্ধার করে ১৫০টি অস্ত্র। এরপর যুদ্ধ করতে তারা চলে আসে চৌগাছা এলাকায়। গরিবপুর এলাকায় ভয়ংকর ট্যাংকের যুদ্ধ হয়। একেবারে মুখোমুখি ট্যাংক যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে সাতটি ট্যাংক হারিয়ে পিছু হটে পাকবাহিনী। এমন বাস্তব গল্পে বিমোহিত হয় এই প্রজন্মের যুবকরা।

মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও জনউদ্যোগ পাঠাগার আয়োজিত স্মৃতিচারণ ১৯৭১ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা রুকুনুউদ্দোলাহ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন জনউদ্যোগ যশোরের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুজ্জামান চাকলাদার মুকুট প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপক বিথীকা সরকার।

মিলন রহমান/এএম/এমএস