ইলিশ শিকারে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা, মাঠে নেমেছেন জেলেরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুয়াকাটা
প্রকাশিত: ০৪:৩৯ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০১৯

ইলিশের ভরা মৌসুম ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে মৎস্যজীবীরা সোচ্চার হচ্ছেন। মৎস্য অধিদফতরের এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করায় জেলেদের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

জেলেদের আশঙ্কা, মাছ ধরার ওপর এ নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের ৬ মাস মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলে বেকার হয়ে যাবেন হাজার হাজার জেলে।

ইলিশের ভরা মৌসুমে নতুন করে ৬৫ দিনের অবরোধ আরোপকে মৎস্যজীবীরা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দাবি করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সংম্মেলন করেছেন। শুক্রবার বেলা ১১টায় কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের হল রুমে এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার মৎস্যবন্দর আলীপুর-মহিপুর বন্দরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভার আহ্বান করেছেন জেলেরা।

সংবাদ সম্মেলনে মহিপুর-আলীপুর-কুয়াকাটা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষে কুয়াকাটা-আলীপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিেটেডের সভাপতি মো. আনছার উদ্দিন মোল্লা লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ২০ মে মৎস্য-২ (আইন) অধিশাখা কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে আগামী ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সকল ধরনের নৌযানের ওপর মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ এ সময়টা মূলত ইলিশের ভরা মৌসুম। বৈশাখ মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ছয় মাস ইলিশের মৌসুম বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র-এই চার মাস (১২০ দিন) ইলিশ শিকারের মৌসুম। এর মধ্যে ভাদ্র মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারেন না। এরপরে সরকার যদি ৬৫ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ বাস্তবায়ন করে তাহলে মৎস্যজীবীদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে। এ পেশা থেকে অনেকই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন।

তিনি বলেন, এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে অবরোধ জারি করলেও ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সমুদ্রের জলসীমায় কোনো অবরোধ না থাকায় ওই সকল দেশের জেলেরা সমুদ্রে অবাধে মাছ শিকার করছেন। তারা এ সময় বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকেও মাছ শিকার করে নিয়ে যান। এতে বাংলাদেশের জেলেরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে একই সময় ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যদি মৎস্য শিকারের ওপর অবরোধ জারি করেন তাহলে দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে। অন্যথায় ভারতসহ অন্যান্য দেশ ইলিশ রফতানি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করবে। এতে বাংলাদেশ ইলিশ রফতানিতে সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে ব্যর্থ হবে। মৎস্য অধিদফতর এমন অবরোধ জারির পূর্বে জেলে ও মৎস্যজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নেয়া উচিত ছিল বলে মত প্রকাশ করেন তারা।

মহিপুর ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. দেলোয়ার গাজী বলেন, ‘সরকারের আইন মেনে ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধি, জাটকা ইলিশ না ধরাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন তারা। নতুন করে ইলিশ মৌসুমে মাছ শিকারে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করায় মৎস্যজীবীদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে। বছরের ৬ মাস (মাছ ধরার মৌসুমে) মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা মানে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় তাদের কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে হবে।’

আলীপুর বন্দরের ট্রলার মালিক আসাদুজ্জামান দিদার বলেন, ‘বেসরকারি হিসাবে সমুদ্রে লক্ষাধিক জেলে ট্রলার রয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় এক কোটি মানুষ জড়িত রয়েছেন। যারা সমুদ্রে মাছ আহরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করে কর্মসংস্থানসহ জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। মাছ ধরার মৌসুমে যদি মাছ করা বন্ধ থাকে তাহলে এসব মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পরবেন। আর এ বেকারত্ব সরকারের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘ এ নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেরা মাছ ধরে নিয়ে যাবে। অরক্ষিত হয়ে পড়বে সমুদ্র।’

এ ব্যাপারে ইকোফিশ প্রকল্পের কলাপাড়া জোনের টেকনিক্যাল অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে এর সুফল পাওয়া যেত। তবে সিণেধাজ্ঞা চলাকালীন বিদেশি জেলেরা যাতে বঙ্গোপসাগরের জলসীমানায় ঢুকে মাছ ধরতে না পারেন সেজন্য নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে যৌথভাবে অভিযান চালাতে হবে। অন্যথায় এ নিষেধাজ্ঞার সুবিধা নেবে অন্যদেশের জেলেরা।’

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনোজ কান্ত সাহা বলেন, ‘মৎস্যজীবীরা এমন নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়ে তার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন।’

এ মৎস্য কর্মকর্তার মতে, এত দীর্ঘসময় নিষেধাজ্ঞা জারি করা ঠিক হয়নি। জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত ছিল। এক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার ছিল কিন্তু সেটা করা হয়নি।’

কাজী সাঈদ/এসআর/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :