চার বৃদ্ধের রিকশা চালানোর গল্প

সাইফ আমীন
সাইফ আমীন সাইফ আমীন , নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৬:৪৬ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০১৯

জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন মো. হানিফ (৭২)। জীবনের চাকা সচল রাখতে ঘুরিয়ে চলছেন রিকশার চাকা। রিকশার চাকা না ঘুরলে সংসারের চাকা যে ঘোরে না তার। একদিন রিকশা না চালালে অনাহারে থাকতে হয় তার পরিবারকে। অদম্য ইচ্ছার জোরে রিকশা চালিয়ে সংসারের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত রোজগারে চলা একটা পরিবারের প্রধান হিসেবে মো. হানিফ পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারপরও ৪৯ বছর ধরে রিকশায় মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

বৃদ্ধ হানিফের আদি বাড়ি ছিল বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া এলাকায়। বহু বছর আগে কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে তা বিলীন হয়ে যায়।

বাবা মৃত সিদ্দিক জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন। পাঁচ ভাই-বোনের সংসার তাদের। অভাব লেগেই থাকতো। এরই মাঝে হঠাৎ করে একদিন সব এলোমেলো হয়ে গেল।

হানিফের বয়স যখন ১২ বছর তার মা হামিদা বেগম মারা যান। এর তিন বছর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। শুরু হয় সৎমায়ের নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে আসেন বরিশাল নগরীতে। আশ্রয় হয় ফুটপাতে। কিছুদিন যাওয়ার পর নগরীর একটি খাবার হোটেলে বাসন মাজার কাজ পান। তখনও তিনি বেতনভুক্ত কর্মচারী নন। এরই মধ্যে এক রিকশা চালকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। হানিফের কষ্টের কথা শুনে রিকশা চালানোর পরামর্শ দেন তিনি। তখন বয়স ১৮ বছর। সেই থেকে আজও রিকশা চালাচ্ছেন হানিফ। এখন বয়স আনুমানিক ৭২ বছর।

Barisal

হানিফের দুই দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে বাহাদুর একটি প্রেসে কাজ করেন। তবে বিয়ের পর বাহাদুর বৃদ্ধ বাবা-মা আর ভাই-বোনের খোঁজ নেন না। ছোট ছেলে একটি গ্যারেজে কাজ করে। মেয়ে মনি বেগমের বিয়ে দিয়েছেন। এখনও দেনার বোঝা তার মাথায়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত রিকশাচালক মো. হানিফ এভাবেই নিজের জীবন সংগ্রামের বর্ণনা দেন।

মো. হানিফ বলেন, বয়স হয়েছে বলে সহজে কেউ তাকে অন্য কাজ দিতে চায় না। বাধ্য হয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। বড় বড় সড়কে রিকশা চালানোর সাহস বা শক্তি কোনোটাই তার নেই। আবার ভাঙা সড়কে রিকশার প্যাডেল চাপতেও কষ্ট হয়।

তিনি জানান, প্রতিদিন ৮০ টাকায় রিকশা ভাড়া নেন। রিকশা চালিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে গ্যারেজ খরচ আছে। থাকার ঘরভাড়া ৩ হাজার টাকা। এ দিয়ে কোনোরকম চলছেন তারা।

মো. হানিফের মতোই জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সংগ্রাম করে সংসার চালাচ্ছেন ৭৮ বছর বয়সী মোসলেম কাজী। ১৯৪২ সালে তার জন্ম। বাড়ি ছিল বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার এলাকায়। এ এলাকায় ভিটেবাড়ি ও ফসলি জমি নিয়ে অনেকটা সচ্ছল জীবন ছিল তাদের। চার সন্তান নিয়ে তাদের সংসার ভালোই চলছিল।

মোসলেম কাজীর ১২ বছর বয়সে বাবা আজিজ কাজী মারা যান। সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর পর দিশেহারা হয়ে পড়েন মা মনোয়ারা বেগম। ওলটপালট করে দেয় সব হিসাব-নিকাশ। সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পরে মা মনোয়ারা বেগমের কাঁধে। তবে দমে যাননি তিনি। মানুষের বাড়িতে কঠোর পরিশ্রম করে মা মনোয়ারা বেগম পাঁচজনের সংসার সচল রাখেন। বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর জমিজমা চাচারা দখল করে নেয়। ভিটেবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয় তাদের। তাই বাধ্য হয়ে মা মনোয়ারা বেগম চার সন্তান নিয়ে চলে আসেন বরিশাল নগরীতে।

সংসারের হাল ধরতে কিশোর বয়সেই রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে হয় মোসলেম কাজীকে। সেই থেকে অবিরাম ৫৩ বছর ধরে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবারও অন্ধকার নেমে আসে তাদের জীবনে। রিকশা নিয়ে বের হলে বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়তে হতো তাকে। পাক হানাদার বাহিনী রিকশা তল্লাশির নামে বিনা কারণে মারধর করতো মোসলেম কাজীকে। তবে সুযোগ পেলেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে গিয়ে বহুবার বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। দেশ স্বাধীন হয়। আবারও সংসার চালাতে রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে হয় মোসলেম কাজীকে। তার তিন সন্তান। বড় ছেলে আসাদ নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে তাকে টাকা খরচ করে হালকা যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ছেলে রোজগার করে সংসারের অভাব ঘুচাবে। আসাদ এখন রাজধানীতে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে গাড়ি চালকের চাকরি করেন। তবে বিয়ের পর আসাদ আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না।

তার মতো দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে চলছেন ৬৭ বছর বয়সী বাবুল তালুকদার। বাবা মৃত তোফাজ্জেল তালুকদার। মা জবেদা বেগম। তাদের আদি বাড়ি ছিল সদর উপজেলার কর্নকাঠি এলাকায়। অনেক আগে নদীভাঙনে তাদের বাড়ি ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে যায়। তখন বাবা তোফাজ্জেল তালুকদার মা জবেদা বেগমকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন বরিশাল নগরীতে। শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই।

নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডে একটি ঘর ভাড়া নেন। সেখানে রাস্তার পাশে চায়ের দোকান দিয়ে বসেন বাবা তোফাজ্জেল তালুকদার। তোফাজ্জেল তালুকদারের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে তখনও ছোট। তার একার উপার্জনে সংসারের চাকা যেন ঘুরতে চায় না। প্রায় দিনই অনাহারে কাটতো তাদের। বাবুল তালুকদার বাবার কষ্ট দেখে কিশোর বয়সেই দিনমজুরের কাজে নেমে পড়েন। উপার্জনের অর্থ তুলে দিয়েছেন বাবার হাতে। কুলির কাজ করেছেন। কখনও করেছেন নির্মাণ শ্রমিকের কাজ। বসে থাকার উপায় নেই। বাবুল তালুকদার দিনরাত পরিশ্রম করতেন সচ্ছলতার আশায়। বাবা ও তার উপার্জনে কিছুটা সচ্ছলতা এসেছিল সংসারে। এর কিছুদিন পর বিয়ে করেন বাবুল তালুকদার। তার বয়স যখন ৩২ তখন তার বাবার মৃত্যু হয়। সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। তবে দমে যাননি তিনি।

Barisal

বাবার মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই নেমে পড়েন কাজে। দিনমজুরির সামান্য আয় দিয়ে আটজনের সংসার কোনো রকমে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ সব এলোমেলো হয়ে গেল। নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে যান বাবুল তালুকদার। প্রাণে বাঁচলেও দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পান। ৭২ দিন হাসপাতালে ছিলেন তিনি। অনেক ঋণ হয় তার চিকিৎসায়। কিছুটা সুস্থ হয়ে রিকশার প্যাডেলে পা রাখেন বাবুল তালুকদার। সেই থেকে আজ প্রায় ২১ বছর রিকশার চাকা ঘুরিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

বাবুল তালুকদার এখন থাকেন বরিশাল নগরীর চাদমারী এলাকার বাস্তুহারা কলোনিতে। তার চার মেয়ে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।

বাবুল তালুকদার বলেন, রিকশা চালানো অনেক খাটুনির কাজ। খুব কষ্ট হয়। শরীর ব্যথা হয়ে যায়। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশায় কষ্ট অনেক কম। সরকার ও প্রশাসন যদি তাদের মতো বয়স্ক ব্যক্তিদের সেই সুযোগটাও দিত তা হলে এতো কষ্ট হতো না।

মো. আব্দুর রব। বয়স ৫৭ এর কাছাকাছি। পেশায় রিকশাচালক। তার জীবন সংগ্রামের কাহিনিও প্রায় একই। ১৮ বছর ধরে তিনি রিকশা চালিয়ে চারজনের সংসারের চাকা সচল রেখেছেন। রিকশার চাকা না ঘুরলে না খেয়ে থাকতে হয় তার পরিবারের সদস্যদের। সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা রোজগার করেন, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। এরপরও তিনি তার দুই মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

আব্দুর রবের আদি বাড়ি বাকেরগঞ্জের রঙ্গশ্রী ইউনিয়নে। অনেক আগে থেকেই পরিবারে অভাব লেগে থাকায় ১২ বছর বয়সেই দিনমজুরি করেছেন অন্যের জমিতে। তবে প্রতিদিন কাজ থাকতো না গ্রামে। এরপর কাজের খোঁজে মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে চলে আসেন বরিশাল নগরীতে। একটি ছোট টিনের ঘর ভাড়া নেন। অচেনা শহর। বয়স কম দেখে কেউ তাকে কাজ দিতে চাচ্ছিল না। একসময় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তবে পিছু হটেননি। এর মধ্যে অনেক জায়গায় কাজ করেন তিনি। ১৮ বছর বয়সে শানু বেগমকে বিয়ে করেন। অভাব থাকলেও সব মিলিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। বিয়ের তিন বছরের মাথায় স্ত্রী শানু বেগম অন্তঃসত্ত্বা হন। কিন্তু হঠাৎ করে সব এলোমেলো হয়ে গেল। ২০০০ সালে ট্রাক থেকে আলুর বস্তা নামাতে গিয়ে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। সুস্থ হওয়ার পরের সংগ্রাম আরও করুণ। চিকিৎসক জানিয়ে দেন ভারী বস্তা বহন করা যাবে না। কিন্তু বস্তা বহন না করলে সংসার চলবে কীভাবে? অনেক চিন্তার পর রাস্তার পাশে চায়ের দোকান দিয়ে বসেন আব্দুর রব। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই দোকানের সব কিছু চুরি হয়ে যায়। তারপরও নিজেকে হারতে দেননি আব্দুর রব। সেই থেকে রিকশা চালিয়ে করছেন জীবন সংগ্রাম। সংসারের চাকা ঘোরাতে ১৮ বছর ধরে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে চলছেন তিনি। নানা ঘটনা আর দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে এই ১৮ বছরে। তবে সংসারের চাকা সচল রাখতে রিকশার হাতল আর ছাড়া হয়নি।

জাগো নিউজকে মো. আব্দুর রব বলেন, রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এ দিয়ে সংসারটা কোনো রকমে চলছে।

আব্দুর রবের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নাজমা আক্তার (১৮)। বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। ছোট মেয়ে মিম আক্তার (১৪)। সে নগরীর কাউনিয়া শেরেবাংলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। রিকশা চালিয়ে দুই মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তিনি বলেন, ইচ্ছা আছে আরও লেখাপড়া করানোর। জানি না কত দিন চালিয়ে যেতে পারব? এরপরও তিনি তার দুই মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

Barisal

রিকশাচালকদের জীবন মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বরিশালে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে আসছে বরিশাল রিকশা ভ্যানচালক শ্রমিক ইউনিয়নের (সদস্যরা। দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে লাঠিপেটা, মামলা ও কারাভোগও করতে হয়েছে সংগঠনটির সদস্যদের।

কারাভোগকারীদের মধ্যে একজন সংগঠনের উপদেষ্টা ডা. মনিষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, রিকশা চালকরা সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণির মানুষ। বৃদ্ধ একজন রিকশাচালক তার সন্তানের বয়সী একজনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তায় বের হলে আমরা এসব চিত্র দেখতে পাই। তবে এসব মানুষকে নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই।

স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থানসহ কোনো রকম নিরাপত্তাই পান না শ্রমজীবী মানুষরা। বরং বরিশালে একটা বৈষম্যের চিত্র লক্ষ্য করা যায়। বয়স্ক রিকশা শ্রমিকরা যন্ত্রচালিত রিকশা চালানোর আন্দোলন অনেক দিন থেকে করে আসছেন। তারপরও তাদের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। এ বয়সে তাদের যে অমানবিক পরিশ্রম করে জীবন যাপন করতে হচ্ছে এটা কোনো উন্নয়নের বাংলাদেশের চিত্র হতে পারে না।

তিনি বলেন, তাদের জীবন মানোন্নয়নে শ্রমজীবীবান্ধব শ্রমনীতি গড়ে তুলতে হবে। এই শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, রেশনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। তাহলে সত্যিকারের উন্নয়ন হয়েছে বলা যাবে। তা না হলে একটি শ্রেণির মানুষ অনুন্নতই থেকে যাবে। তাদের অনুন্নত রেখে সত্যিকারের উন্নয়ন হবে না।

এমএএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :