হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে সন্তানকে শিকলবন্দি করলেন বাবা

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি সাভার (ঢাকা)
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ পিএম, ২২ জুলাই ২০১৯

সাভার পৌর এলাকার রাজাশন মহল্লার রিকশাচালক নূর মোহাম্মদের একমাত্র সন্তান মোস্তফা। ছয় মাস বয়সে অভাবের কারণে শিশু মোস্তফাকে রেখে চলে যান মা। এরপর বাবার আদরে বড় হতে থাকে মোস্তফা।

এরই মধ্যে মোস্তফার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়। ছেলের কথা চিন্তা করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন মোস্তফার বাবা নূর মোহাম্মদ। কিন্তু সৎমায়ের সংসারে সুখ জোটেনি মোস্তফার কপালে। অনাদরে অবহেলায় বড় হতে থাকে সে। কিছুদিন যেতে না যেতে সৎমাও তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে বাবার কাছেই বড় হচ্ছে শিশু মোস্তফা।

এ অবস্থায় মোস্তফাকে স্কুলে ভর্তি করেন বাবা। কিন্তু স্কুলে ঠিক মতো না যাওয়ায় এবং পড়াশোনা না করায় পরে তাকে মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। কিন্তু বাবা-মায়ের অনাদরে বড় হওয়া মোস্তফা সেখানেও টিকতে পারেনি।

পরে একমাত্র সন্তানের কথা চিন্তা করে একবেলা রিকশা চালাতে শুরু করেন বাবা। পাশাপাশি অন্যবেলায় বিভিন্ন মানুষের কাজ করে দেন। শত চেষ্টার পরও শিশু মোস্তফাকে পড়াশোনায় মনোযোগী করতে পারেননি বাবা। বর্তমানে আট বছর বয়সী একমাত্র ছেলের চিন্তায় দিশেহারা বাবা নূর মোহাম্মদ।

ছেলেটিকে বাসায় একা রেখে বাবা বাইরে গেলেই ছেলে বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। সারাদিন লাটিম নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর দুষ্টুমি করে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে কিছুদিন আগে হারিয়ে যায় মোস্তফা। পরে পুলিশের সহযোগিতায় তাকে ফিরে পান বাবা। এরপর নিরূপায় হয়ে ছেলের দুই পায়ে শিকল লাগিয়ে দেন বাবা নূর।

মোস্তফার চাচা মোহাম্মদ আলী বলেন, অভাবের সংসারে মোস্তফার মা নেই। আমি তাকে নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া করানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে কাউকে কিছু না বলে যেখানে-সেখানে চলে যায়। ছেলের জন্য দিন-রাত কাজ করেও মানুষ করতে পারছেন না বাবা।

কেন শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে শিশু মোস্তফা জানায়, ‘আমি সারাদিন লাটিম নিয়ে ঘুরে বেড়াই আর দুষ্টুমি করি। তাই বাবা আমার দুই পায়ে শিকল লাগিয়ে দিয়েছেন। আমি যেন কোথাও চলে না যেতে পারি। আগে আমি স্কুলে যেতাম, এখন আর যাই না। তবে বাবা ভর্তি করে দিলে আবার স্কুলে যাব।’

বর্তমানে শিশুটি সারাদিন লাটিম হাতে অন্যের বাড়িতে এবং রাস্তায় শিকলবন্দি দুই পায়ে লাফিয়ে খেলা করে। সারাদিন অপেক্ষা করে কখন বাবা বাসায় আসবে এবং দুই পায়ের শিকল খুলে দেবে।

বাড়ির মালিক মুক্তিযোদ্ধা জাহিদুর রহমানের স্ত্রী বলেন, শিশুটি ঠিকমতো স্কুলে যায় না। সারাদিন অনেক দুষ্টুমি করে। তার বাবা সারাদিন বাইরে কাজ করে। শিশুটিকে দেখে রাখার মতো কেউ নেই। যাতে হারিয়ে বা দূরে কোথাও চলে না যায় এজন্য তার দুই পায়ে শিকল দিয়ে তালা মেরে রাখা হয়েছে।

প্রতিবেশীরা জানান, শিশুটিকে প্রায় এক মাস ধরে সকালে কাজে যাওয়ার আগে দুই পায়ে শিকল বেঁধে তালা মেরে চলে যান বাবা। এ সময় শিশুটি লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করে। তার বাবা দুপুরে একবার আর রাতে বাড়িতে এসে তালা খুলে দেন।

আল-মামুন/এএম/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :