ভুল সংশোধনের কথা বলে লিখে নিল জমি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ১০:১৯ এএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকের যোগসাজশে দলিল সংশোধনীর নামে দাতাকে ভুল বুঝিয়ে ভুয়া খাজনা রশিদে বিক্রয় কবলা দলিল করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে দাতা বিষয়টি বুঝতে পেরে জেলা জজ আদালতে গ্রহীতাসহ ৭ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। সম্প্রতি সদর উপজেলায় এই ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, শ্রী ধনঞ্জয় বসাক বর্তমানে নাটোরের লালবাজার গ্রামে বসবাস করলেও আদি নিবাস ছিল নওগাঁ সদর উপজেলায়। বাবার নাম মৃত মধুসূদন বসাক। তিনি ২০১২ সালে নওগাঁ শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কোমাইগাড়ী মৌজার ১৩ শতক জমি রানীনগর উপজেলার মৃত কাজেম উদ্দীন মন্ডলের ছেলে হারুনুর রশিদের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু সেই জমির দলিলে দাগ নম্বর ভুল হয়েছে জানিয়ে তা সংশোধনের নাম করে ভুয়া খাজনা রশিদের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে একটি চক্র। এ ঘটনায় নওগাঁ জেলা জজ আদালতে ৭ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন তিনি।

মামলার বিবাদীরা হলেন- নওগাঁ শহরের চকমুক্তার মহল্লার মৃত আব্দুল কাদের প্রামাণিকের ছেলে মেসার্স সামাদ এন্ট্রারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ প্রামাণিক, মৃত গিয়াস উদ্দিন মোহরার ছেলে মাহবুবুল আলম বিদ্যুৎ, কোমাইগাড়ী মহল্লার হারুন অর রশিদ দুলু, কালিতলার শ্রী উজ্জল দাস, খাগড়ার হামিদুল হক, চকপাঁচীরের মাসুদ রানাসহ ৭ জন।

Naogaon-Vumi-1

জানা গেছে, গত ৩/৯/১২ তারিখে ধনঞ্জয় বসাকের কাছ থেকে নওগাঁর রানীনগর উপজেলার মৃত কাজেম উদ্দীন মন্ডলের ছেলে হারুনুর রশিদ শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কোমাইগাড়ী মৌজার ‘আমানা গ্রিন সিটি’ সংলগ্ন এলাকায় সাড়ে ১৩ শতক জমি (খতিয়ান নং- সিএস-২৬৪, এসএ-২৪৭, আরএস-২২৩ এবং দাগ নং সিএস ও এসএ-৫৮২ ও আরএস-৬১৯, দলিল নম্বর- ৬৯৭৬/১২) কিনে নেন।

ঘটনার দীর্ঘ ৭ বছর পর, চলতি বছরের পহেলা মে আব্দুস সামাদ প্রামাণিক জমির গ্রহীতা সেজে মোবাইল ফোনে ধনঞ্জয় বসাককে জানান, বিক্রয় কবলা দলিলে সাবেক ও হাল দাগ ভুল হয়েছে। দীর্ঘদিন আগে করে দেয়া দলিলের গ্রহীতার নাম স্মরণে ছিল না ধনঞ্জয়ের। আব্দুস সামাদ ৬৯৭৬ নম্বর দলিলের জাবেদা নকল তুলে সেটার ফটোকপি করে প্রকৃত গ্রহীতা হারুনুর রশিদের নাম পাল্টে সেখানে নিজের নাম লেখেন। এছাড়া ফটোকপিতে হাল ও সাবেক দাগ নম্বর পরিবর্তন করে শ্রী উজ্জল দাস ও মাসুদ সরদার নামে দুই ব্যক্তির মাধ্যমে নাটোরে ধনঞ্জয় বসাকের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ধনঞ্জয় বসাক ফটোকপি দেখে মনে করেন যে দলিলে দাগ নম্বরগুলো সত্যিই ভুল আছে।

এরপর তিনি দলিল সংশোধনীর নামে পুনরায় সংশোধনী দিতে সম্মত হন। সে মোতাবেক গত চলতি বছরের ২১ মে তিনি নওগাঁ সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে এসে জমির গ্রহীতা হারুনুর রশিদের খোঁজ করেন। এ সময় আব্দুস সামাদ প্রামাণিক নিজেকে হারুনুর রশিদ পরিচয় দিয়ে দলিল সংশোধনী করে নেন। ঘটনার ৩ মাস পর ২০ আগস্ট ধনঞ্জয় বসাক জানতে পারেন দলিল সংশোধন না করে ভুল বুঝিয়ে বিক্রয় কবলা করে নিয়েছে আব্দুস সামাদ। যার দলিল নম্বর ৩৪৪৫/১৯।

ধনঞ্জয় বসাক জানান, যে খাজনার রশিদ দেখিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে সেটিও ভুয়া। ওই খাজনা রশিদ সদর উপজেলার হাঁপানিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নিয়ে যাওয়া হলে, দেখা যায় ওই হোল্ডিংয়ে কোনো জমি নেই। কিন্তু ওই ভুয়া খাজনা রশিদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলিল লেখক সামসুজ্জোহা (সনদ নং-৩০৪) ও সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের যোগসাজশে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।

Naogaon-Vumi-2

অভিযুক্ত আব্দুস সামাদ প্রামাণিক বলেন, বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান আছে। আদালত যে রায় দেবে তা মেনে নিব। তবে ভুয়া খাজনা রশিদের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

নওগাঁ সদর দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক মজিবর রহমান বলেন, গত তিন মাস আগে ভূমিদস্যু আব্দুস সামাদ প্রামাণিককে ভুয়াভাবে জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়ায় দলিল লেখক সামসুজ্জোহাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার সনদপত্র জব্দ করা হয়েছে। সামসুজ্জোহা একজন মাদকাসক্ত। যতক্ষণ না সে ডাক্তারি সনদপত্র নিয়ে সমিতিকে দেখাতে পারছে, তাকে সমিতিতে নেয়া হবে না।

এ ব্যাপারে নওগাঁ সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুজ্জামান বলেন, মূল কাগজপত্র দেখে জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রকাশ হলে ওই দলিল লেখককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া কোনো উৎকোচের বিনিময়ে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

আব্বাস আলী/এমএমজেড/পিআর