বিক্রি করা সন্তানকে ফিরে পেতে আদালতে মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৮:২৭ এএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অভাবের তাড়নায় বিক্রি করে দেয়া ৭ মাসের ছেলে সন্তান আব্দুল্লাহকে ফিরে পেতে আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন মা পারভীন বেগম।

সন্তানকে ফিরে পেতে আদালতে মামলা করেছিলেন পারভীন বেগম। সেই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয় রোববার দুপুরে। শুনানি চলাকালে কান্নায় ভেঙে পড়েন পারভীন বেগম। দুধের সন্তানকে ফিরে পেতে বিচারকের কাছে কাকুতি-মিনতি করেন পারভীন বেগম। মুহূর্তে বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে আদালতের পরিবেশ। এক পর্যায়ে কোমড়ে শাড়ির মধ্যে রাখা কীটনাশকের শিশি বের করে তা পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তার এমন কাণ্ডে আদালতে উপস্থিত সকলে হতচকিত হয়ে যান। হতচকিত হন বিচারকও। এ ঘটনার পরপরই বিচারক সেই দিনের মতো ওই মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন।

ঘটনাটি ঘটেছে বরিশাল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (ক অঞ্চল) রূম্পা ঘোষের আদালতে। বিচারক রূম্পা ঘোষ আগামী ৯ অক্টোবর মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। পারভীন বেগমের বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খাদেমের সমিল সংলগ্ন এলাকায়।

স্থানীয়রা জানান, খাদেমের সমিল সংলগ্ন এলাকার পারভীন বেগমের সঙ্গে কয়েক বছর আগে একই এলাকার দিনমজুর মো. নুরুজ্জামানের বিয়ে হয়। পারভীন বেগম অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে নুরুজ্জামান তাকে ফেলে চলে যান। নিরুপায় হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেন পারভীন বেগম। গৃহকর্মীর কাজ করেন কয়েকটি বাসায়। ৭ মাস আগে পারভীন বেগম একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের নাম রাখেন আব্দুল্লাহ। সন্তান জন্মের পর অভাবে পড়েন পারভীন বেগম।

অভাবের কারণে সন্তানের ভরণ-পোষণ করতে না পেরে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেন তিনি। কিন্তু তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করেনি কেউ। দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের কাছে হার মেনে নিজের দুধের সন্তানটি বিক্রির জন্য বিভিন্ন মানুষের দারস্থ হন। সন্তান বিক্রির কথা শুনে একই এলাকার বাসিন্দা কাছেম মোল্লার ছেলে আনোয়ার মোল্লা পারভীনের কাছে যান। সেই সঙ্গে আনোয়ার মোল্লার সহযোগী বানারীপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের আহমদাবাদ বেতাল গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে মো. সালেক পারভীন বেগমকে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রলোভন দেখান। তাদের দেখানো অর্থের প্রলোভনে পড়ে গত জুলাই মাসে পারভীন তার দুধের সন্তানটিকে আহমাদাবাদ বেতাল ক্লাব সংলগ্ন ফরাজি বাড়ির প্রবাসী গাফ্ফার ফরাজীর নিঃসন্তান স্ত্রী নাছরিন আক্তারের কাছে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। ৭০ হাজার টাকা সন্তান বিক্রি করলেও পারভীন বেগমের হাতে ৪০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন আনোয়ার মোল্লা ও তার সহযোগী সালেক। বাকি ৩০ হাজার টাকা আনোয়ার মোল্লা ও তার সহযোগী সালেক ভাগ করে নেন। একই সঙ্গে সন্তান বিক্রির বিষয়টি পাকাপোক্ত করতে নাছরিন আক্তারের পক্ষে পারভীন বেগমকে আদালতে নিয়ে একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেন তারা।

barishal- Poor-mother-1

এদিকে পারভীন বেগম সন্তান বিক্রির পর ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। দুধের সন্তানকে ফিরে পেতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ধর্ণা দিতে থাকেন তিনি।

এরপর পারভীন বেগম বানারীপাড়া থানা পুলিশের স্মরণাপন্ন হন। থানা পুলিশ উভয়পক্ষের কথা শুনে পারভিনকে সন্তান বিক্রি করে নেয়া টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেয়। পারভীন টাকা না দিয়েই সন্তান দাবি করেন। পুলিশ পারভীনকে টাকা ফেরত দিয়ে সন্তান নেয়ার পরামর্শ দিলে তিনি থানা থেকে চলে আসেন। সন্তানকে ফিরে পেতে গত ২৪ জুলাই বরিশাল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (ক অঞ্চল) আদালতে মামলা করেন।

মামলার বাদী পারভীন বেগমের আইনজীবী তারিকুল ইসলাম বলেন, পারভীন বেগম তার ৭ মাসের ছেলে সন্তান আব্দুল্লাহকে বিক্রি করেননি। সন্তান জন্ম নেয়ার পর প্রবাসী গাফ্ফার ফরাজীর নিঃসন্তান স্ত্রী নাছরিন আক্তারের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন পারভীন বেগম। নাছরিন আক্তার পারভীন বেগমকে ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে দেয়ার কথা বলে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন। এরপর ৭ মাসের ছেলে সন্তান আব্দুল্লাহকে রেখে পারভীন বেগমকে তাড়িয়ে দেয় নাছরিন আক্তার।

আদালতে কি ঘটেছিল জানতে চাইলে আইনজীবী তারিকুল ইসলাম বলেন, দুধের সন্তানের বিরহে আদালতে শুনানি চলাকালে কান্নায় ভেঙে পড়েন পারভীন বেগম। দুধের সন্তানকে ফিরে পেতে বিচারককে আকুতি-মিনতি করেন। আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। এর বেশি আর কিছু বলতে পারবো না। আদালতের ভেতরের অনেক কিছু বাইরে প্রকাশ করা ঠিক নয়।

তবে মামলার বিবাদী নাছরিন আক্তারের আইনজীবী হুমায়ূন কবির বলেন, এজলাসে বিষপান করার চেষ্টার ঘটনা এটাই প্রথম। এটা নিঃসন্দেহে আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা। এধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য পারভিনের কঠিন বিচার হওয়া উচিত। যদি দুর্ঘটনা ঘটত তাহলে ম্যাজিস্ট্রেটসহ আদালতের সংশ্লিষ্টদের বিপাকে পড়তে হতো। বিচারকের প্রচেষ্টায় একটা কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা হয়েছে।

সাইফ আমীন/এমএএস/পিআর