মেয়র বলছেন পৌর এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার বইছে, অথচ হাঁটা যায় না

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ১১:৩১ এএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঝালকাঠি পৌর এলাকার প্রবেশদ্বার সুতালড়ি পুলিশ লাইনের পূর্ব পাশ দিয়ে খাল সংলগ্ন রাস্তা। পৌর এলাকার মধ্যে প্রায় ৪ কিলোমিটার থাকলেও ঝুঁকি নিয়ে যোগাযোগের উপযোগী এক কিলোমিটারেরও কম। বাকি প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তাই যোগাযোগের অনুপযোগী। পৌর এলাকার ৩নং ওয়ার্ড (কৃষ্ণকাঠি) অন্তর্ভুক্ত এলাকাটি।

সুতালড়ি থেকে টাইগার স্কুল পর্যন্ত এ ৪ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে হাজারেরও বেশি বাসিন্দা রয়েছে। রয়েছে বেদে পল্লীও। খালের ভাঙনের কবলে রাস্তা বিলীন হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পথে অন্তত আড়াই কিলোমিটার বেশি পথ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হচ্ছে পৌর এলাকার বাসিন্দাদের।

বেদে পল্লীর সর্দার আ. রহিম জানান, পুলিশ লাইনের পাশ দিয়ে রাস্তাটির পাশে খাল থাকায় ভেঙে যাচ্ছে। আধা কিলোমিটার রাস্তায় আরসিসি ঢালাই কাত হয়ে খালের দিকে হেলে পড়ছে। শেষ প্রান্তে গিয়ে আর কোনো রাস্তাই নেই। একসময় কৃষ্ণকাঠির টাইগার স্কুলে যাতায়াতের পথ ছিল এটাই। খালের ভাঙনে রাস্তা বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও রাস্তার চিহ্ন বহনকারী একটি কালভার্ট ছিল। তাও গত বছর ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে। খালের পানি বৃদ্ধি পেলেই কাত হওয়া আরসিসি ঢালাই রাস্তা ডুবে যায়। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা অগ্নিকাণ্ডের মতো কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিকার পাবার মতো গাড়ি যাতায়াতের কোনো উপায় নেই।

শুধু কৃষ্ণকাঠি নয়, এমন অনেক রাস্তাই রয়েছে যা কাঁদা মেখে বা পেরিয়ে চলাচল করতে হয়। ঝালকাঠি পৌর এলাকাবাসীর প্রশ্ন শহরের অভ্যন্তরে (মূল শহর) রাস্তাঘাট ভালো থাকলেও বর্ধিত পৌর এলাকা নিয়েই তো ঝালকাঠি পৌরসভা। এটা কি আসলেই প্রথম শ্রেণির পৌরসভা?

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রাচীনতম পৌরসভার মধ্যে অনতম ঝালকাঠি পৌরসভা ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন তৃতীয় শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ঝালকাঠি পৌরসভা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ২০০০ সালে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঝালকাঠির কৃতি সন্তান আমির হোসেন আমু ঝালকাঠি পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় রূপান্তর করেন।

বর্তমানে পৌর এলাকায় অনুন্নত রাস্তাসমূহের মধ্যে, গাবখান ব্রিজ থেকে তালুকদার বাড়ি হয়ে ইছানীল স্কুল পর্যন্ত। নেছারাবাদ মাদরাসা থেকে ইকোপার্কসহ পৌরসভার শেষ প্রান্তের রাস্তা। কির্ত্তীপাশা বটতলা থেকে নেছারাবাদ মাদরাসা-জোমাদ্দার বাড়ি হয়ে নেছারাবাদ কেরামত মাওলানার বাড়ি। নেছারাবাদ মাদরাসা থেকে অন্ধ হুজুরের বাড়ি হয়ে কির্ত্তীপাশা সংযোগ সড়ক। পশ্চিম ঝালকাঠি মীরবহর বাড়ি থেকে বারেক ডিলারের বাড়ি হয়ে গাবখান ব্রিজ ও অপরদিকে খাল পর্যন্ত। বাসন্ডা ব্রিজ থেকে আকবরী মসজিদ হয়ে কাটপট্টি ট্রলারঘাট। কাঠপট্টি ট্রলার ঘাট থেকে বান্দাঘাট চৌমাথা হয়ে সিটি পার্ক থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার।

বাশপট্টি, ফরিয়া পট্টি (উদ্বোধন স্কুলের সামনে) কাঠপট্টি শাহী মসজিদ হয়ে কাঠপট্টি ট্রলারঘাট। বিকনা বটতলা হতে স্টেডিয়ামের পেছন থেকে নবগ্রাম রাস্তা। নবগ্রাম রোডের ছারছিনা পীর সাহেবের খানকা হয়ে বিকনা বাজার পর্যন্ত রাস্তা। বিকনা সড়ক হতে স্টেডিয়ামের পেছন পর্যন্ত রাস্তা। বিকনা প্রাইমারি স্কুল থেকে বাসন্ডা ব্রিজ। গণপূর্ত অফিসের সামনে থেকে আনছার ভিডিপি ও ডায়াবেটিস হাসপাতাল যোগাযোগের রাস্তা। পূর্বচাঁদকাঠি বসুন্ধরা সড়ক। বিআইপির পেছনের রাস্তা। পূর্বচাঁদকাঠি গুরুদাম ব্রিজ থেকে উত্তরদিকে পূবালী সড়ক। গুরুদাম ব্রিজের পূর্ব পাশে দক্ষিণ দিকে শহর রক্ষাবাধসহ রাস্তা নির্মাণ পর্যন্ত। কবিরাজ বাড়ি রোড ১ ও ২। সড়ক ও জনপথ অফিসের পেছন থেকে দত্তবাড়ি হয়ে মুন্সিবাড়ি ব্রিজ এবং সুতালড়ি খাল পর্যন্ত রাস্তা। মুন্সিবাড়ি সড়ক থেকে মোল্লাবাড়ি হয়ে তৈয়বিয়া মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা। লঞ্চঘাট হতে ইউজিপ ২ প্রকল্পের রাস্তা। কলাবাগান এলাকায় আরসিসি অভ্যন্তরের রাস্তা।

পশ্চিম ঝালকাঠি এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন জানান, পশ্চিম ঝালকাঠি মীরবহর বাড়ি থেকে বারেক ডিলারের বাড়ি হয়ে গাবখান ব্রিজ ও অপরদিকে বাসন্ডা খাল পর্যন্ত রাস্তাটি চলাচলে চরম অযোগ্য। কাঁদামাটির রাস্তার উপর কলাগাছ দিয়ে চলাচল করতে হয়। পানি উঠলে রাস্তা তলিয়ে স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বই-খাতাও ভিজে গেছে কয়েকবার।

পৌরবাসীর অভিযোগ, রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কার কাজ করা হলেও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল। প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় আবর্জনার কোনো ভাগার নেই। ময়লা অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত গাড়ি বা জনবলও নেই। তাই যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তুপ দেখা যায়। অনেক স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোক্তারা নিজ উদ্যোগে তাদের এলাকা পরিষ্কার রাখার স্বার্থে পয়ঃনিষ্কাশনের কাজ করছে।

ঝালকাঠি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কাজী মহসিন রেজা জানান, বাসন্ডা ব্রিজ থেকে আকবরী মসজিদ হয়ে কাটপট্টি ট্রলারঘাট শহর রক্ষা বাধ ও রাস্তা আড়াই কিলোমিটার। উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে মাছ বাজার হয়ে বাসন্ডা খাল পর্যন্ত ডিপ ড্রেন। ফকিরবাড়ি খাল ডিপ ড্রেন। লঞ্চঘাট থেকে কলাবাগান পর্যন্ত রাস্তা, পার্ক ও বাজার নির্মাণ। পৌর সিটি পার্ক উন্নয়ন। পূর্ব চাঁদকাঠি বসুন্ধরা সড়কে রাস্তাসহ ড্রেন। জেলেপাড়া খাল ১০ ফুট চওড়া ডিপ ড্রেন। বিআইপির পেছনের রাস্তা ও ড্রেন। ব্র্যাক মোড় থেকে পূর্ব চাঁদকাঠি চৌমাথা পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে ড্রেন। পূর্বচাঁদকাঠি গুরুদাম ব্রিজ থেকে উত্তরদিকে পূবালী সড়কে শহর রক্ষা বাধ ও রাস্তা নির্মাণ। গুরুদাম ব্রিজের পূর্ব পাশে দক্ষিণ দিকে শহর রক্ষাবাধসহ রাস্তা নির্মাণ। কবিরাজ বাড়ি রোড ১ ও ২ ড্রেনেজ কার্যক্রমের আওতায় আনা। সুতালড়ি ব্রিজ থেকে পুলিশ লাইনের পাশে বেদে পল্লী হয়ে টাইগার স্কুল যাতায়াতে সুতালড়ি খালে বাধসহ রাস্তা নির্মাণ। সড়ক ও জনপথ অফিসের পেছন থেকে দত্তবাড়ি হয়ে মুন্সিবাড়ি ব্রিজ এবং সুতালড়ি খাল পর্যন্ত রাস্তা ও বাধ নির্মাণ। আধুনকি বাসস্ট্যান্ড, অডিটরিয়াম, বহুতল বিশিষ্ট সুপার মার্কেট, ট্রাকস্ট্যান্ড। বিভিন্ন রাস্তাঘাট এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হানিফ জানান, অতিগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, বাধ ও ড্রেন নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রকল্পে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে টেন্ডার আহ্বান করে কাজ শুরু করা হবে।

প্যানেল মেয়র মাহবুবুজ্জামান স্বপন জানান, পৌর এলাকার বিভিন্ন রাস্তাঘাট উন্নয়নে ৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরু করা হবে। বাকি রাস্তাগুলো পর্যায়ক্রমে বরাদ্ধ পেলে কাজ শুরু করা হবে। পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যাপারে তিনি বলেন, টিনপট্টি ড্রেন পরিষ্কার করা হয়েছে। থানার সামনের ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলমান আছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে পরিষ্কার করা হবে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের প্রতি অসন্তোষ জানিয়ে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বেতন অনেক কম। তাই তারা কাজেও অমনযোগী। এজন্য বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা কাজে আমাদের বেগ পেতে হয়। বিধায় বাইরের দিনমজুর নিয়ে পরিষ্কার কাজ করাতে হয়। আবার সব দিনমজুর ময়লা পরিষ্কারের কাজ করতে চান না।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আমির হোসেন আমু ঝালকাঠি পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় রূপান্তর করেন। তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপির হাত ধরেই ঝালকাঠি পৌরসভার উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বার এমপি নির্বাচিত হয়ে ঝালকাঠি পৌরসভার উন্নয়নের ধারাকে আরও বেগবান করেন।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৪ হাজার ১২৯ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪২ কোটি ৬৩ লাখ ৮ হাজার ৮১২ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮১ লাখ ৬ হাজার ৪১১ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১১ কোটি ৭৩ লাখ ১৮ হাজার ২১০ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪২১ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯ কোটি ৬০ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬৯ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ কোটি ২৬ লাখ ২৩ হাজার ৬৩২ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮ হাজার টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। এছাড়াও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গুরুত্বপূর্ণ শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৪ কোটি টাকা এবং জলবায়ু প্রকল্পের আওতায় ৩ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে।

ঝালকাঠির পৌর মেয়র লিয়াকত আলী তালুকদার জাগো নিউজকে জানান, আমাদের একান্ত অভিভাবক আমির হোসেন আমু এমপি ঝালকাঠির উন্নয়নে খুবই আন্তরিক। তার বিচক্ষণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর কার্যক্রমে ঝালকাঠিবাসী আলোর মুখ দেখেছে। শিল্পমন্ত্রী আমুর আন্তরিকতার কারণেই ঝালকাঠি পৌর এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার বইছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনের বিগত ১০ বছরই শুধু নয় এরপূর্বে তিনি পৌরসভাকে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে, পরবর্তীতে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করেছেন। মন্ত্রীর ঐকান্তির চেষ্টার ফসল ঝালকাঠি আধুনিক ও একটি মডেল শহরে পরিণত হয়েছে। তার একান্ত প্রচেষ্টায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গুরুত্বপূর্ণ শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৪ কোটি টাকা এবং জলবায়ু প্রকল্পের আওতায় ৩ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

আতিকুর রহমান/এমএএস/পিআর