এবার ধর্ষকের সঙ্গে স্কুলছাত্রীর বিয়ে দিলেন এসআই

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ০৮:৪৫ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পাবনায় গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় ডেকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার লালমনিরহাটে ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রীকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সপ্তম শ্রেণির ওই ছাত্রীর মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন লালমনিরহাট সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মাইনুল ইসলাম। সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সুভার বাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

ধর্ষণের ঘটনার ১০৮ দিন পর বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) থানায় মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ষণে অভিযুক্ত শাহিন আলমকে (২৪) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি এসআই মাইনুল ইসলামকে সদর থানা থেকে লালমনিরহাট পুলিশের বি-সার্কেলে বদলি করা হয়েছে।

রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রীর বাবা। পরে ঘটনা জানাজানি হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

জানা যায়, পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের প্রতিবেশী উমাপতি হরনারায়ণ গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে শাহিন আলমের কাছে প্রাইভেট পড়তো ওই স্কুলছাত্রী। এ সুবাদে স্কুলছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শাহিন। একপর্যায়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক এবং গর্ভধারণের ঘটনা ঘটায়।

গত ২৫ জুলাই শহরের একটি ক্লিনিকে নিয়ে জোরপূর্বক স্কুলছাত্রীর গর্ভপাত ঘটায় শাহিন। পরে বিষয়টি জানতে পারে স্কুলছাত্রীর পরিবার। কিছুদিন পর গ্রাম্য সালিশের নামে টালবাহানা হওয়ায় গত ১১ আগস্ট লালমনিরহাট সদর থানায় শাহিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন স্কুলছাত্রীর বাবা।

১২ ও ১৪ আগস্ট দুদিন সদর থানা পুলিশের এসআই মাইনুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করেন। কিন্তু মামলাটি রেকর্ড না করে ধর্ষকের পক্ষ নেন এসআই। এর পরের দিন ধর্ষক শাহিনের সঙ্গে স্কুলছাত্রীর বিয়ে দেন এসআই মাইনুল। পাশাপাশি ছেলেকে ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দিতে ছাত্রীর বাবা বলেন এসআই।

১৭ আগস্ট প্রতিবেশী ইউনিয়ন মহেন্দ্রনগরের বিয়ের কাজি শহিদুল ইসলামের অফিসে এ বিয়ে হলেও স্কুলছাত্রীর পরিবারকে বিয়ের কাবিননামা দেয়া হয়নি।

স্কুলছাত্রীর বাবা বলেন, ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হলেও আমার মেয়েকে ঘরে তুলে নেয়নি শাহিন। গ্রামে প্রচার করছে আমার মেয়েকে ডিভোর্স দিয়েছে সে। সেদিন পুলিশ যদি মামলা রেকর্ড করে আসামিকে গ্রেফতার করতো তাহলে আজকের এই দিনটি আমাকে দেখতে হতো না। আমার মেয়েকে জোরপূর্বক ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার জন্য এসআই মাইনুল ইসলামই দায়ী।

স্কুলছাত্রীর ভাষ্য, শাহিন আলম আমাকে হুমকি দিয়ে বলছে, ‘আমি যদি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিই তাহলে আমার অশ্লীল ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেবে।’ আমি তাকে ভালোবেসেছি সত্যি। কিন্তু ভালোবাসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাকে ফাঁদে ফেলে সর্বনাশ করেছে শাহিন।

স্থানীয়রা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর কেন মামলা না নিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করলেন এসআই? এটা কেমন আইন? প্রাইভেট মাস্টারকে ধর্ষণ মামলা থেকে বাঁচাতে মোটা অংকের টাকা নিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন এসআই মাইনুল।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের বিয়ের কাজি শহিদুল ইসলাম বলেন, এসআই মাইনুল এ বিয়ে সম্পর্কে সবকিছু জানেন। কারণ ধর্ষকের সঙ্গে স্কুলছাত্রীর বিয়ে দিয়েছেন এসআই।

এ বিষয়ে পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার কাছে যখন মেয়ের বাবা বিচার চাইতে এসেছিলেন তখন ঘটনা শুনে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। পরবর্তীতে এসআই মাইনুল ওই ছাত্রীর সঙ্গে ধর্ষকের বিয়ে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত এসআই মাইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি জানি না। আমি এমন কোনো অভিযোগ পাইনি। ফাইলপত্র ঘেঁটে বিষয়টি বলতে হবে।

লালমনিরহাট সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজ আলম বলেন, নির্যাতিত ছাত্রীর পরিবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেয়ার পর বিষয়টি শুনেছি। এরপর এসআই মাইনুলের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেছেন স্কুলছাত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল, তাই গ্রামবাসীর কথায় বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। বুধবার রাতে আমরা মামলাটি রেকর্ড করেছি। সেই সঙ্গে ধর্ষক শাহিন আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম রশিদুল হক বলেন, বিষয়টি তদন্ত করতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে এসআই মাইনুল দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, এ ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাই। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।

এর আগে পাবনা সদর থানায় গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় ডেকে নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেন ওসি। এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হন সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবাইদুল হক।

পড়ুন : ধর্ষণ সংক্রান্ত আরও খবর

রবিউল হাসান/এএম/জেআইএম