পদ্মায় মা ইলিশ ধরার মহোৎসব

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ১০:০৫ এএম, ২১ অক্টোবর ২০১৯

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রজনন মৌসুমে পদ্মা নদীতে মা ইলিশ মাছ ধরার মহোৎসব চলছে। চরাঞ্চলের নারী ও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শহরের ক্রেতাদের কাছে এই ইলিশ মাছ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার পদ্মা তীরের ছয়টি গ্রামকে ইলিশ বহনের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী ও পাবনা জেলার ৩৫ কিলোমিটার পদ্মা নদী এলাকায় প্রতিদিন ধরা পড়ছে কয়েকশ মণ মা ইলিশ। চরে এক কেজি ওজনের ইলিশ মাছ ৫০০ টাকা, জাটকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩০০ টাকা দরে। চর থেকে শহরের ক্রেতাদের কাছে ইলিশ পৌঁছানোর নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে খোকসা উপজেলার পদ্মা নদীর চর অঞ্চলের গোপগ্রাম, আমলাবাড়িয়া, কুঠিপাড়া, আমবাড়িয়া, মকলুর চর ও খাসচরসহ আশপাশের গ্রামগুলোকে। নাম মাত্র পারিশ্রমিকে চরের নারী ও শিক্ষার্থীদের মাছ পাচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

মাছ বহনকারী শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের অভিযোগ, পদ্মা নদী থেকে মাছ শহরে পৌঁছাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন। নদী তীরের ফাঁড়ির পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তারা মাছ কেড়ে নেয়। আবার পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মোটা অংকের টাকারও দিতে হয়।

সোমবার ভোরে সরেজমিনে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার পদ্মা নদীর তিন কিলোমিটার চর পারি দিয়ে খাস চরের কোলের ঘাটে গিয়ে ইলিশ মাছ কেনাবেচার মহোৎসবের সত্যতা মিলেছে। একই চিত্র নদীর কোলের মানুষ পারাপারের সব ঘাটগুলোতে। জেলেদের জালে ধরা পড়া মাছ কিনে অনেকের পালোনোর দৃশ্যও দেখা যায়। মাছ বিক্রি হচ্ছে নদী তীরের চরের কাশবনে, আখ আর ধানক্ষেতে।

মাছ কেনাবেচার এমন দৃশ্য আগে কখনো চোখে পরেনি বলে জানান বৃদ্ধ আছির প্রামাণিক। তিনি জানান, গত দশ বছরের মধ্যে এবারই সব থেকে বেশী মাছ ধরা পড়ছে।

গতকাল রোববার পদ্মা নদীর খাস চরের কোলের ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কোলের ঘাটে পারাপারের নৌকা এসে ভেড়ে। নৌকা থেকে নামেন চারজন যাত্রী, তাদের সঙ্গে বস্তাসহ তিনটি বাজারের ব্যাগ। প্রতিটিতে ১০ কেজির বেশি সদ্য ধরা পড়া ইলিশ মাছ। তাদের মধ্যে একজন নিজেকে সরকারি অফিসের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে বলেন, একজন মুমূর্ষু রোগী পদ্মা নদীর ইলিশ মাছ খেতে চেয়েছেন তাই তিনি মাছ কিনতে পদ্মায় এসেছেন।

KHOKSA-Hilsha

এ সময় দেখা হয় উপজেলা মৎস্য অফিসের অফিস সহায়ক আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে। তার মোটরসাইকেলে পাঁচ কেজি জাটকা। অনেকটা অসহায়ের মতই বললেন- মাছ ফেলে পাচারকারী পালিয়ে গেছেন। ঘটনা যাচাই করতে গিয়ে বেড়িয়ে আসে অন্য তথ্য। পচাই নামে একজন ক্রেতার কাছ থেকে তিনি মাছগুলো জোর করে নিয়ে এসেছেন।

মাছ পাচারের কাজে নিয়োজিত পাংশা মহাবিদ্যালয়ের এক ছাত্র নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, তারা মাছ টেনে দিতে বাধ্য হচ্ছে। নদী পারের প্রভাবশালী মহাজনের কথা না রাখলে তাদের চরে বাস করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তাদের দলের একজন কৃষক হজরত আলী। তিনিও একই অভিযোগ করেন।

কৃষক হজরত আলী বলেন, মহাজনদের সঙ্গে স্থানীয় ফাঁড়ির পুলিশের সখ্যতা রয়েছে। আবার বাগে পেলে পুলিশ মাছ কেড়ে নিচ্ছে। গত শুক্রবার ভোরে জয়ন্তী হাজরা গ্রামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ২মণ ইলিশ মাছ কেড়ে নিয়েছে পুলিশ। সাধারণ মানুষ মাছসহ ধরা পরলে আর রক্ষা নেই। মাছও যাবে, আবার টাকাও গুনতে হবে।

আমবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান খান বলেন, আমার ইউনিয়নের দুইজন মেম্বার মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। ফাঁড়ির পুলিশরা গ্রাম পুলিশদের নিয়ে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা মাছের বড়গুলো নিয়ে যায়। এই ইউনিয়নসহ পদ্মা তীরে কয়েকটি ইউনিয়নের ১৯ হাজার লোক বসবাস করে। এদের মধ্যে ৩ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে পদ্মা নদী থেকে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত।

ভবানীগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের আইসি এএসআই কামাল হোসেন বলেন, মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা অভিযানে যাচ্ছি। জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ মিথ্যা।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদ হাসান বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় আমরা অভিযান চালাচ্ছি। ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের একজনের সাজা হয়েছে। অপরজনের নামে নিয়মিত মামলা দেয়া হয়েছে। অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ কেজি মাছ জব্দ করা হয়েছে।

আল-মামুন সাগর/আরএআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]