জাহালমকাণ্ডকে হার মানাল ১১ বছরের কিশোরী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৪:৪৬ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৯

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার প্রতিমাবংকী গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান বাবুল হোসেন নয়ন। স্থানীয় সরকারি মুজিব কলেজ থেকে চলতি ডিগ্রি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল তার।

কিন্তু স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন নয়ন। ফলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়া হয়নি তার। ২৫ দিন ধরে টাঙ্গাইল কারাগারে তিনি।

এরই মধ্যে জানা গেছে, স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার মূল আসামি বাবুল হোসেন নয়ন নন। মূল আসামি হলেন বাসাইল উপজেলার নয়ন মিয়া।

নয়নের পরিবর্তে বাবুল হোসেন নয়নকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ফলে ২৫ দিন ধরে কারাগারে বন্দি বাবুল হোসেন নয়ন।

এদিকে বিনা অপরাধে বাবুল হোসেন নয়নকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পরিবার। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর সখীপুর উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রী (১১) বাসাইলের চাপড়াবিল এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। চারদিন পর টাঙ্গাইল ডিসি লেকের পাশ থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন। পরিবারের চাপে নয়ন নামে এক ছেলের সঙ্গে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিল বলে জানায় স্কুলছাত্রী।

এ ঘটনায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্কুলছাত্রীর মা বাদী হয়ে প্রতিবেশী শাহজাহান আলীর ছেলে বাবুল হোসেন নয়নকে আসামি করে থানায় অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা করেন। পুলিশ বাবুল হোসেন নয়নকে গ্রেফতার করে স্কুলছাত্রীর মুখোমুখি করলে ধর্ষক হিসেবে চিহ্নিত করে স্কুলছাত্রী। এ সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে স্কুলছাত্রীকে চেনে না এবং কক্সবাজারে যাননি বলে জানান বাবুল হোসেন নয়ন।

কিন্তু স্কুলছাত্রীর জোরালো বক্তব্য এবং অনড় অবস্থানের কারণে পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করে বাবুল হোসেন নয়নকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরে বাবুল হোসেন নয়নকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশকে অনুমতি দেন আদালত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সখীপুর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান বলেন, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নয়ন বার বার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় অধিকতর গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলে।

এসআই আসাদুজ্জামান বলেন, স্কুলছাত্রীর কাছে পাওয়া কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলের ভিজিটিং কার্ডের সূত্র ধরে চলে মামলার তদন্তকাজ। পরে কক্সবাজারের হোটেলে দেয়া মোবাইল নম্বর ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করলে বেরিয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। মূলত প্রেমিক নয়ন মিয়াকে বাঁচাতে নিরপরাধ বাবুল হোসেন নয়নকে ফাঁসিয়ে দেয় কিশোরী।

এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ৭ অক্টোবর ঘটনার মূল হোতা নয়ন মিয়াকে বাসাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রেফতার করা হয়। ধর্ষক নয়ন মিয়া বাসাইল উপজেলার কাশিল ইউনিয়নের বাঘিল গ্রামের ফারুক ওরফে নুহু মিয়ার ছেলে। তার সঙ্গে ওই কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে।

এরই মধ্যে গ্রেফতার নয়ন মিয়া ওই ছাত্রীকে কক্সবাজারের একটি হোটেলে রেখে ধর্ষণ করেছে বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এদিকে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হলেও ২৫ দিনেও কলেজছাত্র বাবুল হোসেন নয়নের মুক্তি মেলেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে তার দ্রুত মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।

বাবুল হোসেন নয়নের বাবা শাহজাহান আলী বলেন, প্রায় এক মাস হয়ে যাচ্ছে আমার নিরপরাধ ছেলেটা জেল খাটছে। অনেক কষ্ট করে আমার ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছি। কিন্তু মিথ্যা মামলায় ছেলেটা ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে পারল না।

রোববার সন্ধ্যায় সখীপুর প্রেস ক্লাবে আসেন নয়নের বাবা শাহজাহান আলী। নিরপরাধ ছেলের মুক্তি চেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি।

এ বিষয়ে সখীপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমির হোসেন বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে এ মামলার মূল রহস্য উদঘাটন ও প্রকৃত অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে মূল আসামি নয় মিয়া। শিগগিরই নিরপরাধ বাবুল হোসেন নয়ন মুক্তি পাবে।

প্রসঙ্গত, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তবে সে সময় তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলে আবু সালেকের বদলে তিন বছর কারাভোগ করেন জাহালম। পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় মূল ঘটনা। আদালতের আদেশে ৩ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম।

পড়ুন : ধর্ষণ সংক্রান্ত আরও খবর

আরিফ উর রহমান টগর/এএম/এমএস