নিষিদ্ধ সময়েও বরিশালের শতাধিক স্থানে চলছে ইলিশের কেনা-বেচা

সাইফ আমীন
সাইফ আমীন সাইফ আমীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৫৭ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০১৯

মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে গত ৯ অক্টোবর মধ্য রাত থেকে আজ ৩০ অক্টোবর মধ্য রাত পর্যন্ত ২২ দিন দেশের ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার নদীতে সব ধরনের মাছ শিকার, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তবে সরকারি এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বরিশাল জেলার শতাধিক স্থানে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ।

এই মাছ বিক্রির জন্য প্রত্যন্ত চরে বসছে অস্থায়ী বাজার। সেখান থেকে মাছ কিনে ব্যবসায়ীরা কিছু এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করছেন। কোথাও প্রকাশ্যে আবার কোথাও গোপনে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। আবার কোথাও পুলিশ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে ইলিশ শিকার ও বিক্রি। এতে ইলিশ প্রজনন নিশ্চিত করা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বরিশাল জেলার মেঘনা, কীর্তনখোলা, পায়রা, পাণ্ডব, কারখানা কালাবদর, তেতুলিয়া, মাসকাটা জয়ন্তী, লালখারাবাদ, আড়িয়ালখা, নয়াভাঙ্গুলী, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, পালরদী, কঁচাসহ বিভিন্ন নদীতে অবাধে চলছে মা ইলিশ শিকার। প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অসাধু চক্রের সহায়তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ইলিশ নিধন চলছে। শিকারের পর জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর কমপক্ষে শতাধিক পয়েন্টে চলছে ইলিশ কেনা-বেচা।

মঙ্গলবার ও সোমবার গত দু’দিনে কথা হয় বেশ কিছু জেলের সঙ্গে। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির সহায়তায় পুলিশ বা প্রশাসনের লোক পৌঁছানের খবর পৌঁছে যায় তাদের কাছে। প্রতিটি নৌকা থেকে সপ্তাহে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে চাঁদা তুলে প্রভাবশালীদের দিয়ে থানা, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করা হয়। তাই নিষেধাজ্ঞা চললেও ইলিশ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে।

barishal-Hilsa-2

জেলেরা জানান, বর্তমানে প্রচুর ইলিশ জালে উঠছে। দিনের চেয়ে রাতেই বেশি নিরাপদ। তাই তারা রাতেই বেশি জাল ফেলছেন। বিক্রির জন্য তাদের কোনো চিন্তা করতে হয় না। সাধারণ ক্রেতারা নদীর তীরে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন মাছ কেনার জন্য। কিছু ক্রেতা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। ফোন দিলেই তারা এসে মাছ নিয়ে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত চরে অস্থায়ী বাজারে ইলিশ নিয়ে আসা এক জেলে জানান, আগে নদীতে জাল ফেললে দু-চারটা ইলিশ ধরা পড়ত। কিন্তু এ সময়ে (নিষেধাজ্ঞা চলাকালে) নদীর নির্দিষ্ট পয়েন্টে জাল ফেলতে পারলেই ডিমওয়ালা ইলিশের সঙ্গে প্রচুর ছোট ইলিশ ধরা পড়ছে।

মাছের এক আড়তদার জানান, এখন গ্রাম-গঞ্জেও বিদ্যুৎ আছে। অনেক বাড়িতে ফ্রিজ আছে। জেলেরা নিষেধাজ্ঞা চলাকালে গোপনে ইলিশ ধরছে। চরাঞ্চলের কিছু এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। আবার যে জায়গায় জেলেরা প্রকাশ্যে বিক্রি করতে পারে না সেখানে কিছু ব্যবসায়ী তাদের কাছ থেকে খুব কম দামে ইলিশ কিনে ফ্রিজে রেখে দেয়। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে তাদের মজুদ ইলিশ বাজারে পাঠাবে। এখন দামও অনেক কম।। প্রতিটি ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ অভিযান শুরু হওয়ার আগে ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এ সময়ে (নিষেধাজ্ঞা চলাকালে) তা কেনা যাচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। আর যারা দাদন দিয়ে রেখেছেন তারা কিনছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা ও মুলাদী উপজেলায় নিষেধাজ্ঞার এ সময় বেশি মাছ শিকার হচ্ছে। এই তিন উপজেলা নদী বেষ্টিত। মেঘনা, কালাবদর, তেতুলিয়া, মাসকাটা, জয়ন্তী, আড়িয়ালখা ও নয়াভাঙ্গুলীসহ বিভিন্ন নদী ঘিরে রেখেছে এই তিন উপজেলাকে।

মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা ও মুলাদী উপজেলার কমপক্ষে ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে যেভাবে অভিযান পরিচালিত হতো, এ বছর তেমনটা হচ্ছে না। অনেকটাই ঢিলেঢালা। আবার ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অসাধু নেতা ও পুলিশের প্ররোচনায় মাছ শিকারের অভিযোগও রয়েছে। মাছসহ আটক করে উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ হরমেশাই পাওয়া যায় এসব এলাকায়। এলাকার কেউ ইলিশ শিকার করে ফেঁসে গেলে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় সমঝোতা হয়। ফলে অনেকেই পার পেয়ে যান।

গত শুক্রবার ভোররাতে লালখারাবাদ নদীতে ইলিশ ধরা অবস্থায় ১০ জেলেকে আটক করে মেহেন্দিগঞ্জ থানা পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে চালান দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগেকে থানা থেকে এএসআই দেলোয়ার ও কনেস্টেবল সুমনকে থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে।

barishal-Hilsa-2

অন্যদিকে বাকেরগঞ্জের পার্শ্ববর্তী বাউফল উপজেলার তেতুলিয়া নদীতে ইলিশ নিধনের অভিযোগে বরিশাল মেট্রোপলিটন বন্দর থানার ৩ সদস্যকে বরখাস্ত ও আরও ৫ পুলিশ সদস্যকে জেলা পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করা হয়েছে। গত রোববার নিয়মবহির্ভূত অভিযানের নামে ইলিশ নিধনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, যারা এ সময়ে ইলিশ শিকার করছেন, এদের মধ্যে মৌসুমি জেলেদের সংখ্যাই বেশি। যারা ক্ষেত-খামারে কাজ করেন, স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেন, টেম্পু-রিকশা চালান তারাও নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ শিকারের জন্য নৌকা ভাড়া করেন। অনেকে কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে এসেছেন ইলিশ শিকার করার জন্য। এসব মৌসুমি জেলেদের কয়েকজন প্রশাসনের হাতে ধরাও পড়েছে।

আনোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, এখনও দাদন ব্যবস্থা রয়ে গেছে। অনেকে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের জালে বন্দি। তারা ঋণ থেকে কোনোভাবে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। দাদন ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে কিছু জেলেকে বাধ্য হয়ে নদীতে নামতে হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞাকালীন সরকারি সহায়তাকে অপ্রতুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রান্তিক জেলেদের অনেকেই সে সুবিধাটুকু পান না। এসব দরিদ্র জেলেকে শুধু খাদ্য সহায়তা দিলে হবে না, তাদের নগদ টাকা সহায়তা দেয়াও জরুরি।

মৎস্যজীবী নেতা আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, অভিযোগ রয়েছে পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড অভিযানে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ট্রলারের মাঝিরা জেলেদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেয়। ফলে যে যার মতো করে নিরাপদ জায়গায় অবস্থান নেয়।

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু সাইদ জানান, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ শিকার বন্ধে জেলায় ৩৫টিরও বেশি টিম কাজ করছেন। এসব টিমের সদস্যরা সার্বক্ষণিক নদীতে টহল দিচ্ছেন। এছাড়া নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ডের সদস্যরাও নদীতে টহল দিচ্ছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকারের দায়ে অভিযানের গত ১৪ দিনে বরিশাল জেলায় ৩২৮ জন ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ইলিশ জব্দ করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৬৪ কেজি। জাল উদ্ধার হয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ মিটার।

তিনি আরও জানান, জেলার কয়েকটি উপজেলায় পুলিশ ও নৌ-পুলিশের অসহযোগিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে জানানো হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ কেনা-বেচার প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। গোপনে কোথাও ইলিশ বিক্রি হয়ে থাকতে পারে। অনেক দুর্গম এলাকা রয়েছে। সেখানে পৌঁছতে অনেক সময় লেগে যায়। সে সুযোগে হয়তো অসাধু ব্যবসায়ীরা এ কাজ করে থাকতে পারে।

নৌ-পুলিশের বরিশাল অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. কফিল উদ্দিন জানান, জনবল ও নৌ-যানে তীব্র সংকট রয়েছে।
বিশাল জলসীমার বিপরীতে যে জনবল রয়েছে তা অপ্রতুল। তারপরেও যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইলিশ শিকারের জন্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিপুল সংখ্যক জেলে নদীতে নামছেন। তাদের ঠেকাতে নৌ-পুলিশ সদস্যরা দিনরাত টহল দিচ্ছেন। জেলেদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা দেয়া হচ্ছে।

অভিযানের খবর আগেই জেলেদের জানিয়ে দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নৌ-পুলিশ সদস্যরা এ কাজ করছেন না। তবে ট্রলার মাঝিদের মাধ্যমে সংবাদ পৌঁছতে পারে। সেজন্য অভিযানে যাওয়া ট্রলার মাঝিদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাইফ আমীন/এমবিআর/এমএস