বুলবুলির বাড়িতে হঠাৎ হাজির ইউএনও

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা
প্রকাশিত: ০৭:৫০ পিএম, ১২ নভেম্বর ২০১৯

তখনও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানেনি। বৈরী আবহাওয়া ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে মাইকে প্রচার করা হচ্ছে ঝড়ের পূর্বাভাস। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। যেকোনো সময় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত হানতে পারে। সবাইকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে, নিরাপদ আশ্রয় নিতে বলা হচ্ছে।। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করবে কিংবা আতঙ্কিত হবেন এটাই স্বাভাবিক।

তবে অন্য আর পাঁচজনের চেয়ে একটু বেশিই আতঙ্কিত রাবেয়া। কারণ তিনি সন্তানসম্ভবা। তার বাড়িটিও একেবারে শিব্সা নদীর কিনারে। বসতঘর, সে তো ফুটো টিনের চালের ছাউনি। যাতায়াতের সরু রাস্তাটিও ভাঙাচোরা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে রাবেয়ার মধ্যে অনেক বেশি ভীতি ও আতঙ্ক কাজ করছিল। তাই আগে-ভাগেই শনিবার দুপুর ২টার দিকে সোলাদানা সাইক্লোন শেল্টারে নিরাপদে আশ্রয় নেন তিনি।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত যত গভীর হয় রাবেয়া উদ্বেগ ততোই বাড়তে থাকে। ঝড় শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত। রাত প্রায় ১টা। চারিদিকে তখন ঘোর অন্ধকার, বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। ঠিক এমনই সময় প্রসব বেদনা শুরু হয় রাবেয়ার। একদিকে রাবেয়ার প্রসব বেদনার যন্ত্রণা, অন্যদিকে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এ দুর্যোগের মধ্যে পরিবারের লোকজন ছুটে যায় পার্শ্ববর্তী গ্রাম্য ডাক্তারকে আনতে। তবে ঝড়ের ভয়ে ডাক্তার আসতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এস এম এনামুল হককে দিয়ে ফোন করানো হয় ডাক্তারকে।

অবশেষে ভোররাতের দিকে ডাক্তার আসেন সাইক্লোন শেল্টারে। অনেক চেষ্টার পর রোববার সকাল ৭টার দিকে যখন ঘূর্ণিঝড় প্রবল গতিবেগ নিয়ে আঘাত হেনেছে এমন সময় রাবেয়ার স্বাভাবিক ডেলিভারি করাতে সক্ষম হন ওই চিকিৎসক। একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান ভূমিষ্ট হয়। বাবা-মা তার নাম দেন ‘বুলবুলি’।

শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক না থাকায় আশ্রয় নেয়া অন্যান্য মানুষ ঝড় শেষে বাড়ি ঘরে ফিরলেও রাবেয়া থেকে যান আশ্রয় কেন্দ্রে। পরে সোমবার পরিবারের লোকজন তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়।

খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকালে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুলিয়া সুকায়না উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যান উপজেলার সোলাদানা গ্রামে শিব্সা নদীর তীরে অবস্থিত রাবেয়ার বাড়িতে। ফুটো টিনের চালের ঘরে চাঁদের আলোর মতো ফুটফুটে বুলবুলিকে দেখেই নিজের কোলে নেন তিনি। অনেকটা সময় নিজের কোলে রেখে মমতা মাখা আদর ও স্নেহ দিয়ে ভরিয়ে দেন বুলবুলিকে।

এ সময় ইউএনও বুলবুলির বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন নানা রকম উপহার সামগ্রী। তাৎক্ষণিকভাবে ফুটো টিনের চালের ঘর মেরামতের যাবতীয় দায়িত্ব নেন জুলিয়া সুকায়না।

ফুটো টিনের চালের ঘরে ইউএনও’র মতো একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে কাছে পেয়ে আবেগ আফ্লুত হয়ে পড়েন বুলবুলির পরিবার। হতবাক হয়ে যান উপস্থিত এলাকাবাসী। সবাই ইউএনওর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলায় যদি জুলিয়া সুকায়নার মতো একজন মানবিক ও মমতাময়ী ইউএনও থাকেন তাহলে দেশের কোনো বুলবুলির মমতা, ভালবাসা, স্নেহ ও আদরের অভাব থাকবে না।

উল্লেখ্য, রাবেয়া খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা গ্রামের কামাল গাজীর মেয়ে। তারা দুই বোন। ছোট বোন স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। রাবেয়া ছোট থাকতে তার বাবা তাদেরকে ফেলে রেখে চলে যান, আজও ফিরেননি তিনি। চার বছর আগে পাশের দেলুটি ইউনিয়নের আমজেদ গাজীর ছেলে দিনমজুর আমিন গাজীর সঙ্গে বিয়ে হয় রাবেয়ার। দুই বছর আগে তার একটি পুত্রসন্তান হলেও জন্মের পরই শিশুটি মারা যায়।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মধ্যে সাইক্লোন শেল্টারে জন্ম নেয়া বুলবুলিকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন রাবেয়া। এজন্য নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করছেন তিনি।

আলমগীর হান্নান/এমবিআর/জেআইএম