সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতালে সবই আছে সেবা নেই

ছামির মাহমুদ
ছামির মাহমুদ ছামির মাহমুদ সিলেট
প্রকাশিত: ০৯:১২ এএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

সকল ধরণের সুযোগ-সুবিধা ও কোটি কোটি টাকার মেশিন থাকা সত্ত্বেও সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতালের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সিলেটের সাধারণ মানুষ। ডায়াবেটিসের কারণে সৃষ্ট কিডনি, চোখ, দন্ত ও হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অনেক মেশিন রাজধানী ঢাকার বাইরে একমাত্র এ হাসপাতালে থাকলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সে খবরটাও জানেন না সেবাগ্রহীতারা।

এমনকি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সিসিইউ চালু করলেও সেটি দীর্ঘদিন থেকে অচলাবস্থায় পড়ে রয়েছে। এছাড়াও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সাধারণ চিকিৎসার বাইরে জটিল রোগীদের সিলেট নগরের অন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ‘রেফার্ড’ করে দেয়া হয়। ফলে স্বল্প খরচে গরিব ও অসহায় রোগীদের সেবা দেয়ার ব্রত নিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর উদাসীনতায় এটি এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

সেবামূলক সকল কার্যক্রম সচল না রেখে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত দিকে অগ্রসর হওয়ায় প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন যুগেও কাঙিক্ষত স্থানে পৌঁছাতে পারছে না হাসপাতালটি।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, জনবল সংকটের কারণে ধুঁকতে থাকা হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে সমিতির মাধ্যমে। সীমিত সংখ্যক জনবল সত্ত্বেও নাম মাত্র ফ্রি দিয়ে প্রতিদিন এখানে তিন শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন তারা।

diabetes

জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ পুরানলেন এলাকায় প্রায় ৬৮ দশমিক ১৯ শতক জায়গায় পাঁচতলা ভবন নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতাল। সিলেট ডায়াবেটিক সমিতির (সিডাস) মাধ্যমেই হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে শতভাগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটিকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন সিলেট ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ রকিব। কিন্তু তার মৃত্যুর পর থেকে হাসপাতালটি কঠিন সময় পার করছে।

বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের ব্যবসা ও রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। হাসপাতালের দিকে তাদের কোনো নজর নেই বললেই চলে। ফলে অনেকটা অভিভাবকহীন অবস্থায় চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি প্রচেষ্ঠায় হাসপাতালটিতে স্বল্প খরচে ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া ডায়াবেটিস রোগের প্রভাবে সৃষ্ট অন্য জটিল রোগের চিকিৎসা প্রদানের জন্য হাসপাতালটিতে মেডিসিন, সার্জারি, নেফ্রোলজি, চক্ষু, গাইনি, দন্ত বিভাগ চালু আছে।

তাছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর পচন অংশে থেরাপির জন্য হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি মেশিন, ডায়ালাইসিস ও বার্নস্কিন ট্রিটমেন্টের সুবিধাও রয়েছে। যা রাজধানী ঢাকার বারডেম হাসপাতালের বাইরে একমাত্র সিলেটেই রয়েছে। এমনকি রয়েছে একটি সিসিইউ বিভাগ। এতো দামি দামি মেশিন থাকা সত্ত্বেও এগুলো দিয়ে কোনো সেবা দেয়া হচ্ছে না ডায়াবেটিস আক্রান্তদের। অত্যাধুনিক একটি সিসিইউ মানের অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও সেটিরও দেখা পান না রোগীরা। যেন একটি জাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখার মত অবস্থা। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে হাসপাতালটিতে গত কয়েক বছর ধরে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সেবার মান মোটেও বাড়েনি।

diabetes

জানা গেছে, একে খান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় আমেরিকা থেকে ২০ লাখ টাকা দামের একটি রোগীর হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি মেশিন ক্রয় করা হয়েছিল। এই আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস আক্রান্ত পচন অংশে থেরাপি দিয়ে পূর্ণরূপে ভালো করা যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে বিষয় সর্ম্পকে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালায়নি।

এমনকি এই মেশিনের সাহায্যে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে ১০/১২জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব। কিন্তু অভিজ্ঞ অপারেটর না থাকায় স্বল্প খরচে এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল গিয়ে বিকল্প চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের।

এছাড়াও হাসপাতালটিতে চক্ষু রোগীদের চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে একটি ফেকো মেশিন। যা দিয়ে প্রতিদিন ৫টি করে মাসে ১৫০টি অপারেশন করা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসকদের অবহেলা ও ‘রেফার্ড’ প্রবণতার কারণে হাতেগোনা কয়েকটি অপারেশন হয়। তাছাড়া হাসপাতালটিতে ৮টি ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে। প্রতিদিন ১৬টি করে মাসে ৪৮০টি ডায়ালাইসিস করার সুযোগ থাকলেও তা করছেন না চিকিৎসকরা। ব্যবহার না হওয়ায় ইতোমধ্যে দুটি ডায়ালাইসি মেশিন অকেজো হয়ে পড়েছে।

এছাড়া ডায়াবেটিক আক্রান্তদের পায়ের গেংগ্রিন রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে হাসপাতালটিতে। এটি ডায়াবেটিক রোগীর পা পচন হলে তা কাটার পূর্ব চিকিৎসা। বেশির ভাগ সময় এই চিকিৎসা করলে অধিকাংশ রোগী পা কাটা থেকে মুক্তি পায়। হাতের কাছে এতো সুযোগ-সুবিধা থাকলেও কোনো কিছুই জানেন না নগরবাসী। এমনকি প্রচারের অভাবে বিষয়টিও চোখে পড়ে না সমিতির কর্তাদের। ফলে আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির। যা নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই।

diabetes

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের ডেন্টাল, চক্ষু, ডায়ালাইসিস, গাইনি, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক রয়েছেন ৩০ জন। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ১৫২ জন। হাসপাতালে রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে ২০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নেয়া হয়। সুস্থ হয়ে ফেরার সময় রেজিস্ট্রেশনের সঙ্গে ডায়াবেটিস রোগ সচেতনতা একটি ‘গাইড’ উপহার দেয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন রোগীর মধ্যে চার থেকে পাঁচজনকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়।

কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে শুরুতেই ৩ হাজার টাকা ফি রাখা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন টেস্ট বাবদ আরও অনেক ফি রাখা হচ্ছে।

সিলেট ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ আহবাব বলেন, সিসিইউ রয়েছে নামেমাত্র। কত শয্যার তাও বলতে পারব না। ওই বিভাগে একটি মাত্র কার্ডিয়াক মেশিন, ইসিজি ও ইকো মেশিন রয়েছে। আর কিছু নেই। এগুলো দিয়ে সিসিইউ চলে না।

diabetes

তিনি আরও বলেন, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি মেশিনের কোনো দরকার নেই। এটা দিয়ে কিছু হয় না। ৩০ বছর চিকিৎসা পেশায় দেখেছি এটার তেমন কোনো দরকার নেই। এই মেশিনগুলো অনেক আগে কেনা হয়েছে। এগুলোর দিকে নজর দিয়ে আর কি হবে। যেটার প্রয়োজন নেই সেগুলো নিয়ে আলোচনার দরকার নেই।

ডায়াবেটিস আক্রান্তদের ডায়ালাইসিস প্রসঙ্গে ডা. এম এ আহবাব বলেন, আমাদের এখানে যে কয়টি ডায়ালাইসিস মেশিন আছে সবগুলোই নষ্ট। একটি ঠিক করলে আরেকটি নষ্ট হয়। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে লাভ হয় না। চক্ষু বিভাগ ভালোভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকও রয়েছেন। তাই ফেকো মেশিন কাজে আসছে।

তিনি বলেন, এই হাসপাতালে যথেষ্ট ভালো সেবা দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে আর কোনো প্রচারণার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

বিভিন্ন সংস্থা যেসব অনুদান দিচ্ছে তা কোথায় যাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ আহবাব বলেন, যা আসে তা দিয়ে কোনো মতে ডায়াবেটিসের সাধারণ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কর্মরত চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খরচ চালানো হচ্ছে। এটাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য আমাদের কিছু পরিকল্পনা আছে। আগামীতে সে মোতাবেক কাজ করা হবে।

আরএআর/জেআইএম