মাসে ৪০ টাকায় ডায়াবেটিস রোগীর চিকিৎসা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১২:৩৬ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ডায়াবেটিস রোগীদের দীর্ঘদিন যাবৎ সুনামের সঙ্গে সেবা প্রদান করে আসছে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি। দক্ষিণবঙ্গের একটি অন্যতম চিকিৎসা সেবা প্রদান প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ডায়াবেটিস রোগ সম্বন্ধে সর্বসাধারণকে সচেতন করে তোলা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ডায়াবেটিস রোগী চিহ্নিত করা, শনাক্ত ডায়াবেটিস রোগীকে চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে ডায়াবেটিসজনিত জটিল রোগ প্রতিরোধ করা, রোগীর ভোগান্তি কমিয়ে জীবনকে অর্থবহ করে তোলা, মৃত্যুঝুঁকি পরিহার করা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি।

সেবার মহান ব্রত নিয়ে ১৯৮৩ সালের ২৫ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি। চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৫ সালের ১ আগস্ট। এরপর ২৫ শয্যা বিশিষ্ট ফরিদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তিন যুগ পেরিয়ে সরকারি ও বেসরকারি অনুদানে আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি।

এ সমিতির রয়েছে বিশাল হাসপাতাল, ডায়াবেটিক মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউটসহ সেবা প্রদানের যাবতীয় অনুসঙ্গ। আজ ডায়াবেটিক সমিতি একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০০৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে নার্সিং ইনস্টিটিউট। ২০০৯-১০ সেশনে শিক্ষার্থী ভর্তির মধ্য দিয়ে ফরিদপুর ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেডিকেল কলেজ যাত্রা শুরু করে। এর সঙ্গে রয়েছে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য হার্ট ফাউন্ডেশন নামের সমিতির আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

জেলা শহর ফরিদপুরে প্রতিষ্ঠিত এ ডায়াবেটিক সমিতি বর্তমানে বিশালাকৃতির প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। গরিব দুঃস্থ রোগীদের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে ডায়াবেটিক সমিতি। জরুরি বিভাগ, আউটডোর ও ইনডোর ছাড়াও ২৪টি বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চিকিৎসাসেবা প্রদান করে থাকেন। হাসপাতালে রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সর্বাধুনিক বিশেষ যন্ত্রপাতি।

foridpur

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার ডায়াবেটিস রোগীরা এখান থেকে সেবা নিয়ে থাকেন। বর্তমানে সমিতির বইধারী রোগী রয়েছেন প্রায় ৭০ হাজার। প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ডায়াবেটিক রোগী এখান থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন। রোগীদের চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এ বি সি ও ডি বিভাগ। ডাক্তার দেখানো, রক্ত পরীক্ষা, প্রসাব পরীক্ষা ও পুষ্টিবিদের কাছ থেকে পরামর্শ ফি বাবদ এ বিভাগের রোগীদের কাছ থেকে মাসিক ৭০ টাকা নেয়া হয়, বি বিভাগের রোগীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা, সি বিভাগের রোগীদের কাছ থেকে ৪০ টাকা এবং ডি বিভাগের রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

এদিকে কিডনি বিকল হওয়া রোগীদের জন্য রয়েছে ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা। ২০১০ সাল থেকে চালু করা হয় এই ব্যবস্থা। ২৩টি মেশিন দ্বারা প্রতিদিন ৬০ জন রোগীর ডায়ালাইসিস সম্পন্ন হয়। স্বল্পমূল্যে এই ডায়ালাইসিস সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। এছাড়া রয়েছে ফুট কেয়ার ইউনিট। পায়ের যে কোনো সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা রয়েছে এই ইউনিটে। মাত্র ২৫ শয্যা দিয়ে শুরু হওয়া হাসপাতালটির বর্তমানে শয্যা সংখ্যা সাড়ে ৪শ। এদিকে গরিব ও দুঃস্থ রোগীদের জন্য বেডের ভাড়া ও পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ১০ শতাংশ ছাড় দেয়া হয়ে থাকে।

মাদারীপুর থেকে আসা ডায়াবেটিস রোগী সুশান্ত সাহা বলেন, হাসপাতালে সেবার মান ভালো হওয়ায় দূর-দুরান্ত থেকে প্রতিদিন হাজারো রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা বেশি আসেন। গরিব রোগীদের জন্য এখানে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও এখানে কম। কিছু কিছু টেস্ট রয়েছে যা এখানে ছাড়া করা সম্ভব নয়। ডায়াবেটিস রোগীদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে এখানে। এছাড়াও হাসপাতালের অভ্যন্তরেই রয়েছে ওষুধের দোকান। ২৪ ঘণ্টাই এখানে ওষুধ পাওয়া যায়।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সরেজমিনে ডায়াবেটিক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডায়াবেটিস রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ এসেছেন শরীয়তপুর থেকে, কেউ মাদারীপুর আবার কেউ এসেছেন রাজবাড়ী থেকে। এছাড়া জেলার নয়টি উপজেলার রোগীও রয়েছেন।

foridpur

কথা হয় শরীয়তপুর থেকে আসা ডায়াবেটিস রোগী সালমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতি মাসে একবার এখানে আসি। বয়স হয়ে গেছে তাই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে ভালো আছি। চিকিৎসাসেবা নিতে খরচও তেমন হয় না।

ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত এবং আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের পূর্ণ সদস্য। এটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত স্বেচ্ছাসেবী অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি পরিচালনার জন্য রয়েছে ২২ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী পরিষদ। সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি মীর নাসির হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক শেখ আব্দুস সামাদ।

ডায়াবেটিক মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর ৯০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। এছাড়া নার্সিং ইনস্টিটিউটে প্রতি বছর ৪০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ালেখা করে থাকে। এছাড়া দেশের দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের কোটা রয়েছে। দরিদ্র মেধাবীরা ফ্রি পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে।

ফরিদপুর ডায়াবেটিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মো. বশির আলম খান মেহেদি জানান, দীর্ঘ ১৩ বছর এখানে কর্মরত রয়েছি। ডায়াবেটিস রোগীসহ বিভিন্ন রোগীদের সেবা প্রদান করে আসছি। এই হাসপাতালে গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ডায়াবেটিস রোগীদের ভরসাস্থলে পরিনত হয়েছে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি।

এ ব্যাপারে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ আবদুস সামাদ বলেন, ১৯৮৩ সালে ছোট্ট একটি ভাড়া নেয়া কক্ষে ডায়াবেটিক সমিতির কার্যক্রম শুরু হয়। আজ সমিতির রয়েছে নিজস্ব জায়গায় একাধিক ভবন। রয়েছে বিশাল হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, হার্ট ফাউন্ডেশনসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতিষ্ঠানগুলো সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ডায়াবেটিস রোগীদের সেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

বি কে সিকদার সজল/আরএআর/জেআইএম