বিয়ে বাড়ির আনন্দ এখন শোকের মাতম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মুন্সীগঞ্জ
প্রকাশিত: ০২:৩৯ এএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের কনকসার গ্রামের বেপারি বাড়িটিতে চলছিল বিয়ের আনন্দ। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা বিয়ে বাড়ির আনন্দ শোকে পরিণত হয়েছে।

শুক্রবার কাবিনের উদ্দেশে বরের বাড়ি থেকে হাসিমুখে কনের বাড়ি ঢাকার কামরাঙ্গীরচর যাচ্ছিল দুটি মাইক্রোবাস। কিন্তু পথিমধ্যে শ্রীনগরের ষোলঘর বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে মাইক্রোবাসের ৯ জনের মৃত্যুতে শেষ হয়ে গেল সবকিছু।

শুধু বরের বাড়ি নয়, যেন শোকাচ্ছন্ন পুরো কনকসার ইউনিয়ন। একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে এতো মৃত্যু তারা কখনও দেখেননি। স্বজনরা হাসপাতাল থেকে মরদেহ আনার পর থেকেই প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন শোকাস্তব্ধ পরিবারের বাড়িতে। বাড়ির সামনে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা নেই প্রতিবেশীদের। তবুও পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেও এই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বইছিল বিয়ে বাড়ির আনন্দ।

বর রুবেল বেপারীর বাবা আব্দুর রশিদ বেপারী (৭০), বোন লিজা (২৪), ভাগনি তাবাসসুম (৬) ও ভাবী রুনা (২৪), ভাবীর বোন রেনু (১২), বরের ভাতিজা তাহসান (৪), ফুপা কেরামত বেপারী (৭০), বরের প্রতিবেশী মফিজুল মোল্লা (৬৫), মাইক্রোবাসচালক বিল্লাল (৪০) নিহত হন।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কনের নাম নিশি। সে ঢাকার কামরাঙ্গীচরের আব্দুর রশীদের মেয়ে। আজ দুপুর পৌনে ১টার দিকে কাবিনের জন্য কনের বাড়িতে বর রুবেল ও তার স্বজনরা দুটি মাইক্রোবাসে যাত্রা করে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মাইক্রোবাসে যাত্রী ছিলেন ১২ জন। যার মধ্যে ড্রাইভারসহ ৯ জন মারা গেছেন।

বর রুবেলের চাচাতো বোনজামাই আব্দুর রউফ বলেন, ‘আমার ঢাকা থেকে এই বিয়েতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি চলে আসি। বিয়ের আনন্দ একটি দুর্ঘটনার কারণে শেষ হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, সড়কে উন্নয়নকাজ হচ্ছে। তাই একটি সরু সড়ক দিয়ে যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ যে বাসগুলো রয়েছে, ওই সব বাসের চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। তাই আজ এই দুর্ঘটনা। চালকরা এতো বেপরোয়া যে তারা রিতিমতো বাসে বাসে প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে যেতে পারে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

একমাত্র ছেলে ও স্ত্রীকে হারিয়ে স্তব্ধ বরের বড় ভাই সোহেল বেপারী। তিনি বলেন, আল্লাহ যাতে কাউকে এ রকম কষ্ট না দেয়।

সোহেলের শ্বশুর আলী নূর সরকার বলেন, কয়েক দিন আগে আমার রেনু কলা খাইতে চাইছিল। ওর জন্য চর থেকে দেশি কলা কিনে আনছি। নূরজাহান খান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস সিক্সে পড়ত। ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল ছিল সে। ২৭ তারিখ ওর বার্ষিক পরীক্ষা ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর রুবেলের খালাতো ভাই জাহাঙ্গীর (৪২), প্রতিবেশী জয়নাল আবেদীন (৫২), সোহরাব (৫৫) ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে জাহাঙ্গীরের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

শনিবার সকাল ১০টায় ব্রাহ্মণগাঁও স্কুল মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর হলদিয়া সাতঘরিয়া কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হবে।

৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি

দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে পাঁচ সদ্যসের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন- শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শ্রীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিআরটিএ'র সহকারী পরিচালক।

তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত নয়জনের দাফন কাজ সম্পন্নের জন্য প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থসহায়তা দেয়া হয়েছে।

ভবতোষ চৌধুরী নুপুর/জেএইচ