বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বাড়িটি আজও অরক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা
প্রকাশিত: ১০:৩৪ এএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

খুলনার পাইকগাছায় বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাড়িটি সংরক্ষণ না করায় বখাটেরা তাদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। বাড়িটি সংরক্ষণে মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকাবাসী।

সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী গুরুদাসীর ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় এবং তার চোখের সামনে স্বামী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করে। তার স্বামী গুরুপদ মন্ডল ছিলেন পেশায় একজন দর্জি। স্বাধীনতাকামী অত্যন্ত সহজ সরল মানুষ ছিলেন তিনি। তার স্ত্রীর ওপর পাক সেনাদের নির্মম অত্যাচারে বাধা দিলে তাকে এবং তার দুই ছেলে ও বড় মেয়েকে গুলি করে হত্যা করে তারা। গুরুদাসীর ছোট মেয়ে যখন মায়ের কোলে দুধ খাচ্ছিল তখন পাক সেনারা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে কাদামাটিতে পুঁতে মারে। গুরুদাসী অতি সুন্দরী হওয়ায় পাক সেনারা তাকে বাড়িতে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালায়। পরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু ততক্ষণে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

গুরুদাসী ছিলেন দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মা। পাক সেনাদের লালসার শিকার গুরুদাসীকে ওই সময় উদ্ধার করে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছেই রাখেন। দেশ স্বাধীন হলে মানসিক ভারসাম্যহীন গুরুদাসীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেও সেখান থেকে চলে আসেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অবশেষে পাইকগাছার কপিলমুনিতে আসেন।

উপজেলা তথা দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে মানুষের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় মাসী। ভিক্ষাই ছিল তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় লাঠি হাতে মানুষকে ভয় দেখানো, হাত পেতে দুটো টাকা চাওয়া এই মানুষটিকে চিনতো না এমন মানুষ খুব কমই ছিল। শুধু উপজেলায় নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাকে চিনত। কারন তিনি স্থির হয়ে কোথাও বসতেন না। শুধু ছুটে বেড়াতেন বিভিন্ন অঞ্চলে। পাগল এই মানুষটি বলতেন- “কবে তার স্বামী, সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার হবে”?

তার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট স ম বাবর আলী এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (সাবেক সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব) মিহির কান্তি মজুমদার স্থানীয় কপিলমুনিতে সরকারি জায়গায় তার বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেন। বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মানবেতর জীবনযাপন করতে করতে ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর এ বাড়িতেই মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুর খবরে সে সময় ছুটে আসেন এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসনসহ সর্ব স্তরের মানুষ। সরকারি তালিকায় তার নাম না থাকায় সাধারণ মানুষের মত শেষকৃত্য অনুষ্ঠান করা হয়। তার বসবাসের বাড়িটি এখন রাতদিন নেশাখোরদের আড্ডা স্থল হয়েছে। তার শেষ কৃত্য অনুষ্ঠানে গঠন করা হয়েছিল বীরঙ্গনা গুরুদাসী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। ওই সময় নেতৃবৃন্দ তার বসবাসের বাড়িটি স্মৃতি যাদুঘর ও পাঠাগার তৈরির ঘোষণা দেন। তবে আজও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। অযন্তে আর অবহেলায় পড়ে আছে গুরুদাসী মাসির স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, একটি কুচক্রীমহল গুরুদাসীর বাড়িটি দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বাড়িটি সংরক্ষণ ও যাদুঘর করার দাবি পাইকগাছাবাসীর।

বাড়িটি সংরক্ষণের ব্যাপারে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট স ম বাবর আলী বলেন, গুরুদাসীর বাড়িটি লাইব্রেরি করার পরিকল্পনা ছিল।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুলিয়া সুকায়ানা বলেন, গুরুদাসীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আলমগীর হান্নান/আরএআর/এমএস