এই দিনে হানাদার মুক্ত হয় টাঙ্গাইল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ১০:৪০ এএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

আজ ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালের এই দিনে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে মুক্ত করেছিল টাঙ্গাইলকে। সেদিন সবার উল্লাসে টাঙ্গাইল ছিল উল্লসিত।

গৌরব গাঁথা সেই দিনের জন্য টাঙ্গাইলবাসীকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য, স্বীকার করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ ও অবর্ণনীয় নির্যাতন। দীর্ঘ নয় মাস লড়তে হয়েছে সে সময়ের আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনেই টাঙ্গাইলের বীর সন্তানরা দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। গঠন করা হয় সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ- ওই সময় যা ‘হাই কমান্ড’ হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিল। সিদ্ধান্ত হয় এ কমিটি টাঙ্গাইলে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবে এবং কেন্দ্রীয় সংগ্রাম কমিটির আদেশ-নির্দেশ মেনে চলবে।

২৬ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত টাঙ্গাইল ছিল স্বাধীন। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় প্রশাসন। ২৬ মার্চ সকালে অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের আদালত পাড়ার বাসভবনে এক সভায় গঠিত হয় টাঙ্গাইল জেলা স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক ও সশস্ত্র গণবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং বদিউজ্জামান খানকে চেয়ারম্যান ও আব্দুল কাদের সিদ্দিকীসহ আরও ৮ জনকে সদস্য করে কমিটি গঠিত হয়। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আব্দুল মান্নান, গণপরিষদ সদস্য শামসুর রহমান খান শাহজাহান, আব্দুর রাজ্জাক ভোলা ছিলেন অগ্রগণ্য। ক্রমান্বয়ে সংগঠিত হতে থাকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা। গণমুক্তি পরিষদ গঠিত হবার পর চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৩ এপ্রিল দখল করে টাঙ্গাইল শহর।

গণমুক্তি পরিষদের উদ্যোগে ২৬ মার্চ টাঙ্গাইল থানায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন এবং ২৭ মার্চ বিন্দুবাসিনী বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় টাঙ্গাইলে স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে নামটি অতি উজ্জল হয়ে আছে, যার অংশগ্রহণে হাজার হাজার দামাল ছেলে সংগঠিত হয়েছিল দেশ মাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে সেই কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ৪০-৫০ জন যুবক এবং কয়েকজন পুলিশ-আনসার ১৭ মার্চ রাতে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজে প্রথম অপারেশন চালান। সেই অপারেশনে দু’জন পাক সেনা কর্মকর্তাসহ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১৫০ জন সৈনিক আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে দুই পাক সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়।

২ এপ্রিল গণমুক্তি পরিষদ নেতৃবৃন্দ জানতে পারেন ৩ এপ্রিল পাক বাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করবে। পাক বাহিনীকে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেয় হাইকমান্ড। কারণ তখন সড়ক পথে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার একমাত্র সড়ক ছিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। পাক বাহিনীকে টাঙ্গাইলের প্রবেশ পথে প্রতিরোধ করতে পারলে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ জেলাকে হানাদারমুক্ত রাখা যাবে। প্রতিরোধের স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয় মির্জাপুর থানার গোড়ান-সাঁটিয়াচড়া নামক এলাকা।

এখানে পাঁচটি পরিখা খনন করা হয়। গড়ে তোলা হয় দু’টি প্রতিরোধ দুর্গ। ঢাকার বাইরে প্রথম সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে ২৩ ইপিআর সদস্যসহ ১০৭ জন বাঙালি পাক বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পাকবাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করলে গণমুক্তি পরিষদ ও হাইকমান্ড নেতৃবৃন্দ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। ৩ এপ্রিলের প্রতিরোধ যুদ্ধের ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে টাঙ্গাইলের ছাত্রজনতা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

২০ এপ্রিল থেকে ২ মে কাদের সিদ্দিকী গোপনে বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। ৪ মের মধ্যে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। টাঙ্গাইলের পাহাড়ি এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন এবং সেখানেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথম দিন কালিহাতী থানার মরিচায় শিবির স্থাপন করা হয়। সেখানে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হয়েছিলেন। পরে মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা সখীপুরের বহেড়াতলীতে চলে যান। সেখানে শুরু হয় এ বাহিনী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার রিক্রুট আর প্রশিক্ষণ। পরবর্তীতে এ বাহিনীরই নাম হয় ‘কাদেরিয়া বাহিনী’। এ বাহিনীর সদস্য ১৭ হাজারে উন্নীত হয়। এছাড়া ১৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবকও কাদেরিয়া বাহিনীর সহযোগী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

কাদেরিয়া বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া যখন চলছিল তখন জেলার অন্যান্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে মুক্তিবাহিনীর দু’একটি দল গড়ে ওঠে।

ঢাকা, টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পরাজিত করে পাক সেনাদের।

১২ মে কালিহাতীর বল্লায় পাক বাহিনী নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। ১২ জুন কাদেরিয়া বাহিনী বল্লা আক্রমণ করে পাক বাহিনীকে নির্মূল করে দেয়। জুনের মধ্যেই কাদেরিয়া বাহিনী টাঙ্গাইলের বিভিন্ন থানা আক্রমণ করে অস্ত্র সংগ্রহ করে। ১১ আগস্ট যমুনা তীরবর্তী ভূঞাপুরের মাটি কাটায় হাবিবুর রহমানের (বর্তমানে মরহুম) নেতৃত্বে ‘জাহাজমারা যুদ্ধে’ কাদেরিয়া বাহিনী ৭টি জাহাজ ও লঞ্চে পরিবহণকৃত তৎকালীন ২১ কোটি টাকা মূল্যের অস্ত্র-গোলাবারুদ জব্দ করে। পাক সেনারা জাহাজ ছেড়ে স্পিডবোটে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়।

১৬ আগস্ট ঘাটাইলের মাকড়াইয়ে পাক বাহিনীর সঙ্গে কাদেরিয়া বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা হাতেম নিহত এবং কাদের সিদ্দিকী আহত হন। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রায় পাঁচ হাজার পাক সেনা এবং সাত হাজার রাজাকার আলবদর টাঙ্গাইলে অবস্থান করে।

এপ্রিল থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী পরাজিত করে পাক সেনাদের। এসব যুদ্ধে ৩ শতাধিক অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা করা হয় টাঙ্গাইল আক্রমণের। একের পর এক নাটিয়াপাড়া, নাগরপুর, চারান, করটিয়া, বাসাইল, ভূঞাপুর, ঘাটাইল, গোপালপুর প্রভৃতি স্থানে পাকবাহিনী পরাজিত হতে থাকে। তারা পালাতে শুরু করে ঢাকার দিকে।

এ সময় মিত্র বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন কাদের সিদ্দিকী। মিত্র বাহিনীর ছত্রীসেনা অবতরণ করে টাঙ্গাইল শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে পৌলি ব্রিজের কাছে। এখানে পাক বাহিনীর সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। শত শত পাক সেনা নিহত হয়। কেউ কেউ পালাতে সক্ষম হয়। গ্রেফতার হয় অনেকে। এর মধ্যে জামালপুর হয়ে মিত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ক্লে এসে যোগ দেন।

১০ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের চারদিকে কাদেরিয়া বাহিনী অবস্থান নেয়। এদিন রাতেই শহরের পশ্চিমে পোড়াবাড়ি দিয়ে কমান্ডার আবদুর রাজ্জাক ভোলা সহযোদ্ধাদের নিয়ে টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে সদর থানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

১১ ডিসেম্বর ভোরে পূর্বদিক দিয়ে প্রবেশ করেন কমান্ডার খন্দকার বায়েজিদ আলম ও খন্দকার আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ দিক দিয়ে আসেন ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমান। আর উত্তরের ময়মনসিংহ সড়ক দিয়ে সাঁজোয়া বহর নিয়ে আসেন কাদের সিদ্দিকী। শহরের কাছাকাছি এলে পাক সেনারা জেলা সদর পানির ট্যাঙ্কের উপর থেকে কাদের সিদ্দিকীর সাঁজোয়া বহরের ওপর গুলিবর্ষণ করে। পাল্টাগুলি গুলি ছোঁড়েন কাদের সিদ্দিকী। একে একে নিহত হয় সেখানকার সব পাকসেনা। বিজয়ীর বেশে টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করেন কাদের সিদ্দিকী। তার কাছে আত্মসমর্পণ করে সার্কিট হাউজে অবস্থানরত পাক সেনারা। মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করে জেলাবাসী।

টাঙ্গাইল মুক্ত দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে স্থানীয় শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে ৬ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে টাঙ্গাইল পৌরসভা। ১১ ডিসেম্বর সকালে জাতির জনকের স্মৃতি ভাস্কর্যে পুষ্পস্তবক অর্পন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কবুতর, বেলুন আর ফেস্টুন উঁড়িয়ে দিবসটির উদ্বোধন করবেন সাবেক সাংসদ, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান খান ফারুক। বেলা ১১টায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। বিকেলে আলোচনা সভা আর সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আরিফ উর রহমান টগর/এমএমজেড/জেআইএম