হুমকির মুখে সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা ‘চরবিজয়’

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)
প্রকাশিত: ০১:০৫ পিএম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

পর্যটন ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া আচরণে হুমকির মুখে কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা চন্দ্রাকৃতির চরবিজয়। সেখান থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে অতিথি পাখি ও লাল কাঁকড়া। এ চরটি শীত মৌসুমে অতিথি পাখির অবাধ বিচরণে মুখরিত থাকে। এছাড়া অসংখ্য লাল কাঁকড়ার সমাবেশে চরের সিংহভাগ ঢেকে যায় অপূর্ব সৌন্দর্যের রঙিন চাদরে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বদৌলতে চরবিজয়ের নাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। প্রকৃতি প্রদত্ত এ আকর্ষণীয় চরটি কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রে যোগ করেছে বিনোদনের নতুন মাত্রা।

Kuakata-Pic

চরবিজয় পর্যটকদের ভ্রমণে পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা কিংবা বিধি-নিষেধ না থাকায় স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে অন্যদিকে পর্যটকদের আনাগোনায় অতিথি পাখি ও লাল কাঁকড়ার বহরে নেমে এসেছে আতঙ্ক। ফলে কমে যাচ্ছে অতিথি পাখি ও লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ। জীববৈচিত্র সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট বিধি-নিষেধের আওতায় এনে চরবিজয়কে পর্যটকদের কাছে নিরাপদ বিনোদন জোন হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছে কুয়াকাটার সুশীল সমাজ।

চরবিজয় ঘুরে দেখা গেছে, আনন্দ ভ্রমণে আসা পর্যটকরা পাখি দেখার কৌতূহল নিয়ে পাখির বিচরণ এলাকায় গিয়ে হৈ-চৈ করছে। পর্যটকদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সাউন্ড বক্সের তীব্র শব্দ, পাখির বিচরণ এলাকায় স্পিড বোটের আকস্মিক প্রবেশ, হৈ-চৈ আর পাখিদের পেছনে ছুটাছুটির কারণে আতঙ্কিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে অসংখ্য অতিথি পাখি। ফলে ওই চরে কমে গেছে অতিথি পাখির বিচরণ।

Kuakata-Pic

অন্যদিকে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা অসংখ্য লাল কাঁকড়া দেখে মনে হবে যেনো মনোরম লালগালিচা। অথচ পর্যটকদের অব্যহত উচ্ছৃঙ্খলতায় এ লাল কাঁকড়ার উপস্থিতি এখন আর উল্লেখযোগ্য হারে দেখা যায় না।

সাগরের বুকে জেড়ে ওঠা প্রায় পাঁচ হাজার একর আয়তনের চরবিজয় ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ২০১৭ সালে সমুদ্রে মাছ শিকারে গিয়ে জেলেরা চরটি প্রথম দেখতে পান। তখন জেলেরা এর নামকরণ করেন হাইরের চর। পরবর্তীতে পটুয়াখালীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মাছুমুর রহমানের নজরে এলে ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর তিনি চরটি পরিদর্শন করেন। পূর্ব থেকে পশ্চিমে বাঁকানো চন্দ্রাকৃতির ওই চরটির নাম তখন চন্দ্রদ্বীপ প্রস্তাব করা হয়। পরে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী ও পর্যটকের দাবির প্রেক্ষিতে বিজয়ের মাসে চরটি দেখতে পাওয়ায় চরবিজয় নাম বহাল থাকে। বনায়নের উদ্দেশ্যে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক আব্দুল বারেক মোল্লার উদ্যোগে চরটিতে বিভিন্ন প্রজাতির চারা গাছ রোপণ করা হয়।

Kuakata-Pic

চরবিজয়ে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা অতিথি পাখির কলরব আর লাল কাঁকড়ার দুর্লভ দৃশ্য দেখে বিমুগ্ধ হলেও পাখি বিতাড়নের দৃশ্য দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে। ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি আকতার ও সীমা জানান, প্রকৃতির অপার দান চরবিজয়। এ চরের সৌন্দর্য ধরে রাখতে অতিথি পাখি ও লাল কাঁকড়া সংরক্ষণ করা জরুরি। লাইফ জ্যাকেট, দ্রুতগামী পর্যটক পরিবহনের ব্যবস্থা, পর্যটক ছাউনি, কটেজ, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা সুবিধা দিয়ে চরটি সরকারিভাবে ভ্রমণের উপযুক্ত করা হলে পর্যটক সমাগম বেড়ে যাবে।

এদিকে চরবিজয়ে রাত্রিযাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিশ্চিত নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পর্যটকদের ভ্রমণে নিতে শুরু করেছে কুয়াকাটার ব্যবসায়ীরা। জলদস্যুদের হামলায় বার বার আক্রান্ত হওয়া জেলে খলিলুর রহমান বলেন, পুলিশ প্রশাসন না থাকলে এখানে রাত্রিযাপন নিরাপদ নয়।

Kuakata-Pic

ট্যুরিস্ট পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (কুয়াকাটা জোন) জহিরুল ইসলাম বলেন, কোনোক্রমেই পর্যটককে রাতে ওই চরে অবস্থান করতে দেয়া যাবে না। ইতোমধ্যে স্থানীয় ট্যুরিজম বোট মালিকদের পর্যটক নিয়ে ওখানে রাত্রিযাপন না করার নির্দেশ দিয়েছি। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিবুর রহমান জানান, অতিথি পাখি ও লাল কাঁকড়া সুরক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনোভাবেই রাতে পর্যটকরা ওই চরে থাকতে পারবে না। এ ব্যাপারে ট্যুরিস্ট পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আরএআর/জেআইএম