চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুশয্যায় মুক্তিযোদ্ধা, ইউএনওকে দেখে কাঁদলেন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ০৮:৩৫ পিএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
গুরুতর অসুস্থ নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার পাশে ইউএনও এসএম জামাল আহমেদ

গুরুতর অসুস্থ পাবনার তালিকাভুক্ত একমাত্র জীবিত নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা বেগমকে (৮০) দেখতে গেলেন সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম জামাল আহমেদ।

অসুস্থ নারী মুক্তিযোদ্ধার দিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) বিকেলে ভানু নেছার বাড়িতে গিয়ে নগদ অর্থ ও শীতবস্ত্র দেন ইউএনও। এ সময় ইউএনওকে দেখে অসুস্থ ভানু নেছার স্বজনরা আবেগাপ্লুত হন। ইউএনওকে ধন্যবাদ জানান তারা।

পাঁচ মাস আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা বেগম। মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় এই নারী মুক্তিযোদ্ধা এখন বাকরুদ্ধ। ভাঙা ঘরে ময়লা বিছানায় মৃত্যুর প্রহর গুণছেন তিনি। অর্থাভাবে ভানু নেছার চিকিৎসা করাতে পারছে না তার দরিদ্র পরিবার। কেউ তার খোঁজখবর নেয় না। মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছেন তার সন্তানরা। সেই সঙ্গে অসুস্থ মাকে বাঁচাতে আকুতি জানান তারা।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম জামাল আহমেদ বলেন, সদ্য যোগ দিয়েছি সাঁথিয়ায়। এসেই মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার অসুস্থের কথা জানতে পারি। জাগো নিউজে তাকে নিয়ে সংবাদ দেখে বাড়িতে ছুটে আসি। ভানু নেছার দুই ছেলে শ্রমিকের কাজ করেন। তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাই ভানু নেছার চিকিৎসার জন্য কিছু অর্থ সহায়তা করেছি। ভানু নেছা ভাঙা ঘরে মেঝেতে শীতে কষ্ট পাচ্ছেন দেখে শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করেছি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকেলে ভানু নেছার বাড়িতে আসেন ইউএনও জামাল আহমেদ। এ সময় ইউএনওকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা।

ভানু নেছার পুত্রবধূ সূর্য খাতুন বলেন, ছয় বছর ধরে আমার শাশুড়ি অসুস্থ। এর আগে অনেকেই সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও খোঁজখবর রাখেননি। তবে ইউএনও সহায়তা করায় ও তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে আরও সাহায্যের আশ্বাস দেয়ায় আমরা সবাই খুশি।

freedom

নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছেন ইউএনও

ভানু নেছার বড় ছেলে ইউনুস আলী বলেন, পাঁচ মাস আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন মা। পাবনা সদর হাসপাতাল এবং ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে তার চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু মা পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। অর্থাভাবে তার চিকিৎসা চালিয়ে নেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় মাকে ফিরিয়ে আনা হয় বাড়ি। এরপর থেকে বিনা চিকিৎসায় আরও অসুস্থ হতে থাকেন মা। কয়েক মাস ধরে তিনি বাকরুদ্ধ। শারীরিকভাবে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছেন। বলা চলে যেকোনো সময় মারা যাবেন মা। আজ তার পাশে ইউএনও এসে দাঁড়িয়েছেন। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

ভানু নেছার নাতি মনিরুল ইসলাম বলেন, আমার দাদির খোঁজখবর এখন কেউ নেয় না। ইউএনও আজ এসেছেন। সাহায্য করেছেন। তিনি আমাদের কলেজে পড়াশোনার খোঁজখবর নিয়েছেন। জানিয়েছেন আর্থিক সমস্যায় পড়লেই যেন তাকে জানাই। তার এমন আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পাবনায় ও ঢাকায় এনে মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা বেগমকে সম্মানিত করে। একই সঙ্গে বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা থেকেও তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থতার সময়ে কেউ তার খোঁজখবর নেয়নি। এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী তিনি।

সাঁথিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল লতিফ বলেন, ভানু নেছা ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের সঙ্গে অনেক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোলাবারুদ মাথায় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকারে পৌঁছে দিয়েছেন। একবার তিনি গুলিতে আহতও হয়েছিলেন।

কমান্ডার আব্দুল লতিফ আরও বলেন, ভানু নেছা সাঁথিয়া স্বাধীন না পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখায় পরবর্তীতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। আজ তার অবস্থা সংকটাপন্ন। তার অসহায়ত্বের অবস্থায় ইউএনও মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তার জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানাই আশি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ভানু নেছা বেগমের স্বামীর নাম আব্দুল প্রামাণিক। অনেক আগেই মারা গেছেন তার স্বামী। ভানু নেছার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তার ছেলেরা দিনমজুরের কাজ করেন। মায়ের সরকারি ভাতা এবং নিজেদের সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার। দিনমজুরের কাজের টাকায় মায়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না সন্তানরা।

একে জামান/এএম/জেআইএম