সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় আজও কাঁদেন শতবর্ষী মা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৯:২১ পিএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন নুরুল ইসলাম নুরু। বাবা-মায়ের দোয়া নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া ২২ বছর বয়সী নুরুল ইসলাম যুদ্ধ চলাকালীন একবার মা-বাবাকে দেখতে এসেছিলেন।

এরপর আর মায়ের কোলে ফিরতে পারেননি তিনি। দেশ স্বাধীন হলে অন্য সব মায়ের মতো সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় থাকেন নুরুলের মা। কিন্তু মাস পেরিয়ে বছর গেলেও আর ফেরেননি নুরুল ইসলাম।

এরই মধ্যে এই মা খবর পান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন নুরুল ইসলাম। সেই থেকে শুরু হয় তার কান্না। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও কান্না থামেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের মা ফুলবানুর। বর্তমানে শতবর্ষী এই মা বিছানায় পড়ে আছেন। খাওয়া-দাওয়া গোসল সবকিছুই তাকে এখন বিছানায় করতে হয়।

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে শহীদ নুরুল ইসলামের মাকে দেখতে যান সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। শনিবার দুপুরে দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের বাড়িতে যান ডিসি।

এ সময় ডিসি আব্দুল আহাদকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুল ইসলামের মা ফুলবানু। শতবর্ষী মাকে বুকে জড়িয়ে আবেগাপ্লুত হন ডিসি। পরে রত্নগর্ভা মাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। একই সঙ্গে শতবর্ষী মাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন এবং তার জন্য নিয়ে আসা বিভিন্ন উপহার সামগ্রী তুলে দেন ডিসি।

সুনামগঞ্জের ডলুরা শহীদ সমাধিসৌধে ৪৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থলের ৮নং সমাধিস্থলে রয়েছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম নুরু।

sunamgonj1

শহীদ নুরুল ইসলামের ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম বলেন, বাবা-মায়ের আদরের সন্তান ছিলেন মোজো ভাই নুরুল ইসলাম। আমাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন শিক্ষিত। সুনামগঞ্জের সরকারি জুবীলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে যখন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন তখনই মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। যুদ্ধের সময় একবার বাড়িতে এসেছিলেন ভাই। এরপর আর ফিরে আসেননি। দেশ স্বাধীনের পর খবর পেলাম ভাই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। মায়ের বয়স ১১০ বছর। এখন মা হাঁটতে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া গোসলসহ সব কিছুই ঘরেই করতে হয়। এখনো ভাইয়ের জন্য কাঁদেন মা।

বর্তমানে কিভাবে চলছে আপনাদের সংসার- এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, অভাবের সংসার আমাদের। খুব কষ্টে বেঁচে আছি। ভাইয়ের ভাতার যে টাকা পাই তা মায়ের চিকিৎসায় চলে যায়। আমি অন্যের জমি চাষাবাদ করে যা ফসল পাই তা দিয়ে সংসার চলে। ফসল ভালো হলে মা ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোনোমতে চলে আমাদের সংসার।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, মা সবসময় ভাইয়ের জন্য কাঁদেন। মোজো ভাইয়ের বন্ধুরা বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে তাদের দিকে তাকিয়ে কাঁদেন মা। হঠাৎ কোনো যুুদ্ধের গান বা যুদ্ধের গল্প শুনলে ভাইয়ের জন্য কান্না থামে না মায়ের।

সুনামগঞ্জের ডিসি আব্দুল আহাদ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের মধ্যে নুুরুল ইসলাম ছিলেন একজন। স্বাধীনতার এত বছর পরও নুরুল ইসলামের মা বেঁচে আছেন জেনে দেখা করার আগ্রহ তৈরি হয়। তাই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসটা যথাযথভাবে পালনের জন্য রফিনগর গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের মাকে দেখতে যাই।

তিনি আরও বলেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, আমরা তাকে কোনোদিন ভুলব না; তার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তাদের রক্তের বিনিময়ে আজকের বাংলাদেশ। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন তাদের কথা চিরদির স্মরণ রাখে সেই প্রচেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছি আমরা।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন শিকদার, দিরাই উপজেলার চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর আলম চৌধুরী, দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সফি উল্লাহ, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোহন চৌধুরী, রিপা সিনহা, দিরাই প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান লিটন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ চৌধুরী প্রমুখ।

মোসাইদ রাহাত/এএম/এমএস