রাজাকারের তালিকা তৈরির টাকা গেল কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৯:০৪ পিএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন মনীষা চক্রবর্তী

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেছেন, রাজাকারের তালিকা বাতিল না করে স্থগিত করা জাতির সঙ্গে তামাশা। রাজাকারের তালিকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম কাটানোর আবেদন জাতির জন্য চরম লজ্জা আর অপমানের বিষয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার অধিকার কারও নেই। অবিলম্বে রাজাকারের তালিকা বাতিল করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের বরিশাল জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মনীষা চক্রবর্তী। একই সঙ্গে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের পদত্যাগের চেয়েছেন বাসদের নেতারা।

নগরীর ফকিরবাড়ি রোডের দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর রাজাকারের তালিকা তৈরিতে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করার মানসিকতায় আজ পুরো জাতি স্তব্ধ। স্বরাষ্ট্র এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী যদি পূর্বের কোনো তালিকা পেনড্রাইভে দেয়া হয় এবং তা হুবহু প্রকাশ করা হয়, তাহলে তালিকার জন্য বরাদ্দকৃত ৬০ কোটি টাকা কোথায় গেল, কিভাবে খরচ হলো তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

‘রাজাকারের তালিকা করতে খরচ ৬০ কোটি টাকা’ শিরোনামে কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে মনীষা চক্রবর্তী বলেন, তালিকা প্রকাশে লুটপাট-দুর্নীতি হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে আগের মতো সময়ক্ষেপণ করে ধামাচাপা দেয়া যাবে না। এর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি দেয়া না হলে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ ও তালিকা স্থগিতে আমরা শান্ত হব না। লড়াইয়ের মাধ্যমে আমরা দাবি আদায় করব।

মনীষা চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাজাকারের তালিকা প্রণয়ন অবশ্যই জরুরি। রাজাকারের তালিকা প্রস্তুত করতে পৃথক কমিশন গঠন করতে হবে। এখনো গ্রাম-শহরে অনেক মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন। সেসময়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করা অনেক বয়স্ক মানুষও বেঁচে আছেন। কমিশন গঠন করে এসব মানুষের মতামতের সমন্বয়ে একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। পরে তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। এতে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকতে হবে খসড়া তালিকার ওপর। পরবর্তীতে সেগুলো তদন্ত করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কোনোভাবেই আমলা বা দলনির্ভর তালিকা গ্রহণযোগ্য হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে বাসদের জেলা আহ্বায়ক ইমরান হাবিব রুমন, রিকশা-ভ্যান চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল মল্লিক, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি সন্তু মিত্র ও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সহ-সভাপতি মাফিয়া বেগম উপস্থিত ছিলেন।

সদ্য স্থগিত হওয়া রাজাকারের তালিকায় বরিশালের ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম ছিল। ওই তালিকায় বাসদ নেত্রী মনীষা চক্রবর্তীর বাবা মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তী ও তার মা উষা রানী চক্রবর্তীর নাম ছিল।

এছাড়া বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকের হাতে নিহত শহীদ সেরনিয়াবাতের বাবা আব্দুল হাই সেরনিয়াবাত, ভাষা সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা মিহির লাল দত্ত, তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিতেন্দ্র লাল দত্ত ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কারাগারে বন্দি থাকা জগদীশ চন্দ্র মুখার্জির নামও ছিল।

তালিকা প্রকাশের পর বরিশালে সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। নানা বিতর্কের মুখে রাজাকারের তালিকা স্থগিত করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রকাশ করা হবে। বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম আরিফ-উর-রহমান জাগো নিউজকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বিজয় দিবসের আগের দিন রোববার (১৫ ডিসেম্বর) ১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে ঘোষিত তালিকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর ও ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুসহ রাজশাহীর আরও দুই ব্যক্তির নাম ছিল ওই তালিকায়, যারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ছিলেন বলে প্রমাণ রয়েছে।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, রাজাকারের তালিকা প্রণয়নের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়নি, বরাদ্দ চাওয়াও হয়নি। কাজেই একটি পয়সাও খরচের প্রশ্নই ওঠে না। এটি একটি অসত্য কথা। ‘রাজাকারের তালিকা করতে খরচ ৬০ কোটি টাকা’ শিরোনামে কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।

সাইফ আমীন/এএম/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]