আ.লীগ নেতাদের আতঙ্কে থাকেন স্পিডবোট চালক কুলসুম ও খাদিজা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৭:৫৭ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২০

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির ও মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ না মার্জিয়া সুলতানা মিতুর বিরুদ্ধে দুই নারীকে স্পিডবোট চালাতে বাধা ও হুমকি দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি স্পিডবোটে যাত্রী বহনে বিরত রাখতে একাধিকবার হামলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ওই দুই নারী দাবি করেন।

হয়রানির শিকার দুই নারী স্পিডবোট চালকের নাম কুলসুম বেগম (২৮) ও খাদিজা বেগম (৩৮)। কুলসুম বেগম গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের মধ্য চরবিশ্বাস গ্রামের আবুল সরদারের মেয়ে। খাদিজা বেগম একই ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম চরবিশ্বাস গ্রামের মৃত আদু আকনের স্ত্রী।

তারা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির ওরফে কবির মাস্টারের তিনটি লঞ্চ, দুটি ট্রলার ও চারটি স্পিডবোট রয়েছে। অন্যদিকে মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ না মার্জিয়া সুলতানা মিতুর রয়েছে ছয়টি স্পিডবোট। এছাড়া গলাচিপার অভ্যন্তরীণ নৌরুটে আরও একজন প্রভাবশালী লঞ্চ মালিক রয়েছেন। তার নাম সাবু গাজী। তার পাঁচটি লঞ্চ রয়েছে। গলাচিপা থেকে চরমোন্তাজসহ বিভিন্ন নৌপথে এসব লঞ্চ চলাচল করে। তারা তিনজন মিলে গলাচিপা অভ্যন্তরীণ নৌরুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন।

Kulsum-Khadiza-1

কবির মাস্টার, মিতু ও সাবু গাজী মনে করেন, এ দুটি স্পিডবোট চললে তাদের লঞ্চ ও স্পিডবোটে যাত্রী কমে যায়। এ কারণে হুমকি দিয়ে আসছে, তারা যেন স্পিডবোট না চালান। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত তারা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।

তারা বলেন, স্পিডবোট না চালালে কীভাবে চলবে আমাদের সংসার, এ চরে কে কাজ দেবে আমাদের? দুর্গম এ চরাঞ্চলে মাছ ধরা আর কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই। গ্রামের পুরুষরাই এসব কাজ করেন। বর্ষার পর কার্তিকের ধান কাটা হলে তারাও প্রায় কর্মহীন। সেখানে নারীদের কাজ পাওয়া কঠিন।

খাদিজা বেগম বলেন, ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। স্বামী আদু আকন ব্যবসায়ী ছিলেন। বিয়ের ১৪ বছরের মাথায় আদু আকন মরণঘাতী ক্যান্সারে ভুগে মারা যান। সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পরে তার কাঁধে। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের পড়ালেখা এবং দু’বেলার অন্ন জোগাড় করতে তাকে স্পিডবোট চালাতে হচ্ছে।

স্পিডবোট চালক কুলসুম বেগম বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর সংসারে অভাবের কারণে ২০১০ সালে তাকে বিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের পর যৌতুকের জন্য প্রায় নির্যাতন করতো শ্বশুর বাড়ির লোকজন। এর মধ্যেই জন্ম নেয় ছেলেসন্তান। সংসারে নতুন সদস্য আসায় বেড়েছে খরচ, বেড়েছে নির্যাতনের মাত্রাও। তবে সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে নির্যাতন সহ্য করে যেতেন তিনি। এরপরও সংসারের ভাঙন ঠেকানো যায়নি। স্বামী ফিরোজ মল্লিক যৌতুক নিয়ে অনত্র বিয়ে করেন। এরপর শুরু হয় সতিনের নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিন বছরের ছেলে নাহিদকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে চলে আসেন বাবার বাড়ি। সেই যে বাবা আবুল সরদারের বাড়িতে ফিরে এলেন, আর বিয়েমুখো হননি তিনি।

Kulsum-Khadiza-2

তিনি আরও বলেন, বাবা দিনমজুর। বয়সের কারণে নিয়মিত কাজ পেতেন না। কষ্টের শেষ নেই। এক রকম খেয়ে না খেয়ে দিন যায়। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য কাজ খুঁজতে থাকেন তিনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে অর্থ উপার্জন করবেন- সেটাও এ চরে সম্ভব নয়।

কারণ এখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের বৃহৎ অংশই অতিদরিদ্র। চরের সুযোগ-সুবিধাবিহীন পরিবেশ অর্থ উপার্জনের পথে যেন পাহাড়সমান বাধা। তবে দমে যাননি তিনি। কাজের সন্ধানে এক চর থেকে আরেক চর চষে বেড়াতে থাকেন। খুঁজতে খুঁজতে একটা সময় জানতে পারেন চর বিশ্বাস ও চর কাজলের অসহায় নারীদের জীবনমান উন্নয়নে স্পিডবোট চালনার প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তার মনে জাগল নতুন স্বপ্ন আর শক্তি। স্পিডবোট চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে উপার্জন করবেন অর্থ। ছেলে নাহিদকে লেখাপড়া শেখাবেন। বৃদ্ধ বাবার হাতে তুলে দেবেন টাকা।

কুলসুম বেগম বলেন, ২০১৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অ্যাকশন এইডের আর্থিক সহায়তায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। অ্যাকশন এইডের অংশীদার সাউথ এশিয়ান পার্টনারশিপ (স্যাপ)। পরে এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় অ্যাসোসিয়েশন অব ভলান্টারি অ্যাকশনস ফর সোসাইটি (আভাস)। বর্তমানে অ্যাসোসিয়েশন অব ভলান্টারি অ্যাকশনস ফর সোসাইটির (আভাস) প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।

কুলসুম বেগম জানান, ৯ জন নারী ও ১১ জন পুরুষকে স্পিডবোট চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে চার বছর ধরে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা, দাড়ছিড়া, বুড়াগৌরাঙ্গসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে স্পিডবোট চালিয়ে অর্থ উপার্জন করেন তিনি।

কুলসুম বেগম বলেন, চরকাজল ও চরবিশ্বাসের ৯ জন নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এখন মাত্র দুজন নারী এ পেশায় টিকে রয়েছেন। এর মধ্যে তিনি ও খাদিজা বেগম। প্রভাবশালীদের বাধা ও নানা সমস্যা এর কারণ।

তিনি বলেন, লঞ্চঘাটগুলোতে নৌযানের জন্য যাত্রীরা অপেক্ষা করেন। কিন্তু প্রভাবশালীদের বাধার কারণে বেশিরভাগ ঘাট থেকেই তাদের স্পিডবোটে যাত্রী ওঠা-নামা করতে দেয়া হয় না। এজন্য সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই বসে থাকতে হয়। তবে চর এলাকায় কারও সঙ্কটাপন্ন অবস্থা হলে খোঁজ পড়ে তাদের। দুর্গম চরাঞ্চল থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছতে তারাই যেন একমাত্র ভরসা।

কুলসুম বেগম বলেন, গত মাসে (ডিসেম্বর) মাত্র পাঁচটি ট্রিপ পেয়েছি। পাঁচজন রোগী। তাদের অবস্থা ছিল সঙ্কটাপন্ন। এর মধ্যে একজন ছিলেন গর্ভবতী মা। বিষ পান করা এক নারী ও স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী ছিল তিনজন। দ্রুতগতিতে স্পিডবোট চালিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলাম হাসপাতালে। পরে জেনেছি চিকিৎসার পর পাঁচজনই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তখন মনে প্রশান্তি পেয়েছি।

Kulsum-Khadiza-3

খাদিজা ও কুলসুম বেগম অভিযোগ করে বলেন, প্রথম দিকে স্পিডবোট চালিয়ে ভালোই উপার্জন হতো। কোনো কোনো মাসে ২০-২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেত। তবে এখন মাসে ৫ হাজার টাকা উপার্জন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কারণ প্রভাবশালী কয়েকজন লঞ্চ মালিক স্পিডবোট চালাতে বাধা দিয়ে আসছেন। এদের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির মাস্টার ও সাবু গাজী তাদের লঞ্চের খালাসি এবং কর্মচারীদের দিয়ে কয়েকবার বাধা দিয়েছেন। লঞ্চের খালাসি ও কর্মচারীরা হামলার চেষ্টাও করেছেন একাধিকবার। এসব কারণে এখন স্পিডবোট নিয়ে বের হলে আতঙ্কে থাকি। কখন কি হয়। বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরাও দুশ্চিন্তা করেন।

খাদিজা ও কুলসুম বেগম বলেন, কবির মাস্টারের মামা হারুন অর রশিদ গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার প্রভাব দেখান। পটুয়াখালীর অভ্যন্তরীণ নৌপথে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির।

এছাড়া অ না মার্জিয়া সুলতানা মিতু নামে এক নারী স্পিডবোট ব্যবসায়ী রয়েছেন। তিনি গলাচিপা উপজেলা মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। মার্জিয়া সুলতানা মিতুর মা নুরুন্নাহার বেগম উপজেলা মহিলা লীগের সভাপতি। তার ভাই উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আহসানুল হক তুহিন বর্তমান পৌর মেয়র। মার্জিয়া সুলতানা মিতুর ছয়টি স্পিডবোট রয়েছে। এসব স্পিডবোট বিভিন্ন অদক্ষ চালক দিয়ে যাত্রী পরিবহন করান। বোয়ালিয়া থেকে কোড়ালিয়া নৌপথে এসব স্পিডবোট চলাচল করে। এর মধ্যে দুটি স্পিডবোটের রুট পারমিট নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

খাদিজা ও কুলসুম বেগম বলেন, ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা গেলেও প্রভাবশালী ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ চরে বসবাস করা বড় কঠিন। তাদের একের পর এক ষড়যন্ত্র আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। আমাদের হেনস্তা করতে এমন কিছু নেই তারা বাকি রেখেছেন।

প্রভাবশালীরা সালিশ বসিয়ে একাধিকবার অপবাদও দিয়েছেন। মামলা দিয়ে হয়রানি করারও ভয় দেখান তারা। তবে সাহস হারাইনি। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চোখ রাঙানি ও বাধা উপেক্ষা করেই বোট চালিয়ে যাচ্ছি।

কুলসুম বেগমের প্রতিবেশী আবু সায়েম গাজী জানান, তীব্র নদীভাঙন, বন্যা, খরাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বেকারত্ব- এসব মোকাবিলা করেই চরের মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। বেশিরভাগ মানুষই দরিদদ্র। এখানে নারীদের প্রতি অবহেলা, উপেক্ষা ও বঞ্চনার মাত্রাও বেশি। সেখানে দুই নারী স্পিডবোট চালাচ্ছেন- এটা চরবাসীর জন্য চমক।

মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম জানান, কুলসুম আমার স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। অভাব-অনটনের কারণে তার আর লেখাপড়া এগোয়নি। কম বয়সেই তার বিয়ের খবর পেয়েছিলাম। কয়েক বছর পর জানতে পারি নির্যাতনের কারণে স্বামীর ঘর তাকে ছাড়তে হয়েছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সে স্পিডবোটচালক।

Kulsum-Khadiza-4

অ্যাসোসিয়েশন অব ভলান্টারি অ্যাকশনস ফর সোসাইটির (আভাস) প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, চরবিশ্বাস ও চরকাজল বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে ২০১৫ সালের শেষ দিকে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের অধীনে অসহায় নারীদের জীবন মান উন্নয়নে প্রথমে একটি পরে আরেকটি স্পিডবোট কেনা হয়। পেশা হিসেবে নেয়ার পর প্রায় দু’বছর নারী চালকরা ভালোই উপার্জন করতেন। বর্তমানে তাদের তেমন উপার্জন নেই।

অভিযোগের বিষয় জানতে উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সদস্য লঞ্চ মালিক হুমায়ুন কবিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, আমরা ঢাকা থেকে রুট পারমিট নিয়ে গলাচিপায় স্পিডবোট চালাচ্ছি। তারা রুট পারমিট ছাড়াই স্পিডবোট চালাতে চায়। এ কারণে কেউ হয়তো তাদের রুট পারমিট ছাড়া চালাতে নিষেধ করেছে। তবে বাধা দেয়ার মতো কোনো ঘটনা তার জানা নেই।

উপজেলা মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ না মার্জিয়া সুলতানা মিতু বলেন, ‘আমি একজন নারী। নারী হয়ে নারীদের বিরোধিতা করবো কেন? তাদের বার বার বলেছি সমঝোতা করে বোট চালাতে। আমাদের সমিতির সদস্য হতে। তবে আমার এ প্রস্তাবে তারা কর্ণপাত করেননি। সব কিছুরই নিয়ম আছে। তাদের উচিত আমাদের সঙ্গে সমঝোতা করে স্পিডবোট চালানো। তা না হলে সবারই সমস্যা হবে।’

লঞ্চ মালিক সাবু গাজী বলেন, কুলসুম ও খাদিজা বেগম রুট পারমিট ছাড়াই কয়েক বছর ধরে স্পিডবোট চালাচ্ছেন। হয়তো লঞ্চ কর্মচারীরা রুট পারমিটের বিষয় তাদের কিছু বলে থাকতে পারে। তবে বাধা দেয়ার অভিযোগ সত্য নয়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পটুয়াখালীর বন্দর কর্মকর্তা খাজা সাদিকুর রহমান জানান, রুট পারমিট দেয়া হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে। গলাচিপা ও তার আশপাশ এলাকায় ২০-২৫টি স্পিডবোট থাকতে পারে। এর মধ্যে ১৬-১৮টির রুট পারমিট রয়েছে। তবে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের কোনো নারী স্পিডবোট চালান কিনা- সে বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

সাইফ আমীন/এমএএস/পিআর