চার বছর ধরে ১৪ হতদরিদ্রের চাল খেয়েছেন ৩ ইউপি সদস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০১:০৬ পিএম, ০৩ জুন ২০২০

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার ইউনিয়ন পরিষদের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে হতদরিদ্র ১৪ জনের স্বাক্ষর জাল করে ৪ বছর যাবৎ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় নাম ও কার্ড থাকায় নগদ সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ১৪ ভুক্তভোগী।

ঘটনা জানাজানি হলে ভুক্তোভোগীরা ওই তিন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করেছেন। পাশাপাশি ওই তিন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ করেছেন। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে।

ভুক্তোভোগীরা হলেন, বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মলুহার গ্রামের দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৮১২) আব্দুল মজিদ, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৮৫২) মো. সুলতান, কৃষক (কার্ড নম্বর ৮১৭) জাকির হোসেন, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৮৬৩) আব্দুছ ছালাম, কৃষক (কার্ড নম্বর ৮৬৭) মেজবা উদ্দিন, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৮৭২) মো. মাসুম, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৮৬৬) মো. ফজলু, মেকার জহিরুল, একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মলুহার গ্রামের দিনমজুর (কার্ড নম্বর ১০৬৭) আনোয়ার হোসেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (কার্ড নম্বর ১১১৩) মো. তারিক, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ১০৪৪) ইসরাত জাহান, একই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইলুহার গ্রামের দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৫৭) মো. মনিরুল, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৬১) সাহাদাত হোসেন এবং দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৫৩) মো. মজিবর।

অভিযুক্তরা হলেন, বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মন্টু এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল কালাম।

Barishal-2

ভুক্তোভোগীরা লিখিত অভিযোগে বলেন, খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি চাল দেয়ার কথা বলে ওই তিন ইউপি সদস্য ২০১৬ সালে তাদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন। তবে ২০২০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এক মুঠো চালও পাননি তারা। কার্ডটিও তারা চোখে দেখেননি। করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকার দরিদ্রদের নগদ সহায়তা দেবে এমন খবর জানতে পেরে ঈদের আগে তারা ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগ করেন। তখন জানতে পারেন তাদের নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড (নম্বর-৪৭৮) রয়েছে। সেই কার্ডের বিপরীতে নিয়মিত চালও তোলা হয়েছে। অথচ তারা কিছুই জানেন না।

ভুক্তোভোগীরা লিখিত অভিযোগে আরও বলেন, ১ নম্বর ওয়ার্ডের ডিলার মো. ইয়াছিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, ইউপি সদস্য আবুল কালাম অভিযোগকারীদের মধ্যে ওই ওয়ার্ডের ৩ জনসহ ১২ জনের চাল উঠিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া কার্ডগুলো ইউপি সদস্য আবুল কালামের কাছে আছে। বিষয়টি জানাজানি হলে ইউপি সদস্য আবুল কালাম অভিযোগকারীদের মধ্যে ওই ওয়ার্ডের ৩ জনের কার্ড ফেরত দেন। কার্ডগুলোতে দেখা যায় ২০১৬ সাল থেকে মোট ১৭ বার স্বাক্ষর জাল করে প্রতি কার্ডের মাধ্যমে ৩০ কেজি করে ৫১০ কেজি চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের এসব অনিয়ম জানাজানি হলে আরও দু’টি ওয়ার্ডের চাল অত্মসাতের বিষয়টি বেরিয়ে আসে। একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুস সালাম ৮ জনের ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল ইসলাম মন্টু ৩ জনের চাল আত্মসাৎ করেছেন। ওই তিন ওয়ার্ডে ১৪ জন দরিদ্রের ৫১০ কেজি করে ৭ হাজার ১৪০ কেজি চাল তারা আত্মসাৎ করেছেন।

Barishal-3

লিখিত অভিযোগে তারা আরও বলেন, ইউনিয়নে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির তালিকায় হতদরিদ্র মানুষের নাম থাকার কথা থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে অস্তিত্বহীন ও গোপন রেখে অন্তত শতাধিক ব্যক্তির নাম স্থান পেয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে তাদের নামে চাল তুলে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় ১৪ জনের কার্ডের বিপরীতে আত্মসাৎকৃত চাল ফেরত পেতে এবং চাল আত্মসাৎকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত অভিযোগে তারা অনুরোধ করেন। পাশাপাশি চাল না পেলেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় নাম ও কার্ড থাকায় নগদ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তারা অভিযোগ করেছেন।

তারা বলেন, গত সোমবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে তাদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এছাড়া লিখিত অভিযোগের অনুলিপি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডাকযোগে পৃথকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

অনিয়মের বিষয়ে জনতা বাজারের ডিলার মো. ইয়াছিন বলেন, ঢালাওভাবে চাল না দেয়ার অভিযোগ সঠিক না। যে কার্ড নিয়ে এসেছে তাকে চাল দেয়া হয়েছে। যাদের কার্ড হারিয়েছে তাদের চালও কেউ না কেউ এসে তুলে নিয়ে গেছেন। একবার ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদ ও স্থানীয় রব আমীন ১২ জনের কার্ডের চাল তুলে নিয়ে গেছেন।

Barishal-3

চাল আত্মসাৎ প্রসঙ্গে ইলুহার ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, যারা এখন বলছেন চাল পাননি তাদের বিগত সময়ে কার্ডের মাধ্যমে চাল নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা চাল তোলেননি। তাদের গাফিলতির কারণেই তারা চাল পাননি।

৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মন্টু বলেন, তালিকা তৈরির পর ডিলার বা উপকারভোগীর কাছে কার্ড থাকার কথা। কিন্তু শুনেছি অনেকে সেই কার্ড রক্ষণাবেক্ষণ করেননি। এসব কারণে হয়ত দু’একজন সময়মতো চাল পাননি। বিষয়টি ডিলার ও উপকারভোগীরা ভালো বলতে পারবেন।

এছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল কালাম বলেন, তার ওয়ার্ডের ৩টি কার্ড ডিলার ইয়াছিন হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণে তাদের চাল উত্তোলনে সমস্যা দেখা দেয়। এরপরও তাদের চাল দেয়া হয়েছে।

ইলুহার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে চালের চাহিদা বেড়েছে। কিন্ত চালের দাম যখন কম ছিল অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। কার্ড থাকা সত্ত্বেও তারা চাল উত্তোলন করেননি। এখন তারাই এ ধরনের অভিযোগ তুলছেন।

বানরীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ আব্দুল্লাহ সাদীদ জানান, অভিযোগ হাতে পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাইফ আমীন/এফএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]