৪ মাস ধরে বেতন পান না ফরিদপুর চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৮:৩০ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০২০

চার মাস ধরে বেতন পান না ফরিদপুর চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় আট শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী তাদের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ১৯৭৪ সালে ফরিদপুর চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চিনিকলটির যাত্রা শুরু হয়। চিনিকল ও সাবজোনসহ মোট ১২৯ একর জমি রয়েছে চিনিকলের। ১৯৭৬-৭৭ মাড়াই মৌসুম শুরু হয়ে চিনিকলটির ৪৪তম মাড়াই মৌসুম শেষ হয়েছে গত বছর। এ বছর আগামী ডিসেম্বর মাসে ৪৫তম মাড়াই মৌসুম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

এ পর্যন্ত মোট ৪৪টি মাড়াই মৌসুমের মধ্যে ৯টি মাড়াই মৌসুমে লাভের মুখ দেখে প্রতিষ্ঠানটি। ওই ৯ মাড়াই মৌসুমে লাভ হয় ১৪ কোটি ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এছাড়া বাকি ৩৫ মাড়াই মৌসুমে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয় ৪৭৮ কোটি ১৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। তবে এর মধ্যে আবগারি শুল্ক, ভ্যাট, আয়কর ও বিএসআরআই খাতে প্রতিষ্ঠানটি দিয়েছে ১০২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

সর্বশেষ ৪৪তম মাড়াই মৌসুমে ৮৬ দিনে ৪ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। চিনি আহরণের হার ছিল ৫.৪০%। এই মাড়াই মৌসুমে লোকসান হয় ৬১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

faridpur-sugar-mil

এদিকে ফরিদপুর চিনিকলে এখনও দুই হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন চিনি অবিক্রিত অবস্থায় গোদামজাত হয়ে পড়ে আছে। যার মূল্য ১৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এই চিনি বিক্রি হলে শ্রমিকদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করা যেত। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এদিকে চিনির মূল্য ৬০ টাকা কেজি দরে নির্ধারিত থাকলেও বাজারে বেসরকারি কোম্পানির চিনির দাম কম থাকায় চিনিও বিক্রি করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

বর্তমানে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন মিলের আট শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা। শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের চার মাসের বেতন প্রায় ৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। আখচাষিদের পাওনা রয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

faridpur-sugar-mil

সাইফুল নামে এক আখচাষি বলেন, আমি এই চিনিকলে নিয়মিত আখ সরবরাহ করি। পাওনা টাকা ও ভর্তুকিসহ প্রায় ২০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। আশ্বাসের পর আশ্বাসেও মিলছে না পাওনা টাকা। পরিবার নিয়ে এই করোনার সময় বেশ কষ্টে দিন অতিবাহিত করছি।

চিনিকলের শ্রমিক শাহেদ বলেন, আমি এখানে লেবার হিসেবে কাজ করি। চার মাসের কাজের বিল এখানে পড়ে আছে। কোনোভাবেই টাকা পাচ্ছি না। শুধু কর্মকর্তারা আশ্বাস দেন। বিভিন্নজনের কাছে ধরনা দিয়েও টাকা তুলতে পারছি না। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।

এদিকে ২০১৪ সাল থেকে ফরিদপুর চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত ২৭৯ জন শ্রমিক-কর্মচারীরা গ্রাচ্যুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও সরকারঘোষিত মজুরি কমিশনের টাকা এখনও হাতে পাননি। তাদের প্রায় ২৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ বিষয়ে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান, সচিব, হিসাব নিয়ন্ত্রক ও ফরিদপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

faridpur-sugar-mil

অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক আলী আকবর শেখ বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ অবসরে গিয়েছি। এখনও আমাদের গ্রাচ্যুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও মজুরি কমিশনের বকেয়া টাকা পাইনি। আমরা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও বকেয়া পাওনা পরিশোধের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

ফরিদপুর চিনিকল শ্রমজীবী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কাজল বসু বলেন, করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগে টাকা না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটছে আখচাষিসহ শ্রমিক-কর্মচারীদের। শ্রমিক-কর্মচারীদের চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।

তিনি আরও বলেন, চিনিকলে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চিনি অবিক্রিত রয়েছে। বেসরকারি কোম্পানির চেয়ে আমাদের চিনির দাম বেশি হওয়ায় বিক্রিও করতে পারছি না। চিনি বিক্রি করতে পারলে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হতো। চিনি বিক্রির জন্য প্রতিদিনই বিভিন্ন সরকারি অফিস ও ব্যবসায়ীদের কাছে যাওয়া হচ্ছে।

faridpur-sugar-mil

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া ফরিদপুর চিনিকলটি টিকিয়ে রাখতে ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন শ্রমিক নেতা কাজল বসু।

ফরিদপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ গোলাম কবির বলেন, গত মৌসুমের অবিক্রিত প্রায় ১৫ কোটি টাকার চিনি এখনও মজুত আছে। এই চিনি বিক্রি হয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। শ্রমিকদের পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিদফতরকে অবহিত করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি খুব দ্রুত এই সমস্যার সামাধান হবে।

এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া গ্রাচ্যুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও মজুরি কমিশনের বকেয়া প্রায় ২৫ কোটি টাকার বিষয়টিও চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছে বলে জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বি কে সিকদার সজল/আরএআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]