যেই ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ সেই ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক তদন্ত কমিটিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট
প্রকাশিত: ০৬:৫৪ পিএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই নিরাপত্তা কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক মো. জামাল উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকেই তদন্ত কমিটির সদস্য করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় আলোচনা-সমলোচনা চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক মো. জামাল উদ্দিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের কয়েকটি ব্লক দখল করে রেখেছিল ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। ২০১২ সালেও তিনি ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক থাকাকালে অন্য ছাত্রদের কক্ষ থেকে তাড়াতে গিয়ে ছাত্রাবাসটি পুড়িয়ে দেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তখনকার সময়েও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক মো. জামাল উদ্দিনের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এ বিষয়ে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ বলেন, ছাত্রাবাসের বিস্তারিত বিষয় জানার জন্যই ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক মো. জামাল উদ্দিনকে তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। তিনি ওই ছাত্রাবাসের অনেক পুরাতন তত্ত্বাবধায়ক। তার অনেক বিষয় জানা রয়েছে। অতীতে কি হয়েছে আর বর্তমানে কিভাবে কি ঘটনা ঘটেছে তা জানার জন্যই তাকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো কারণ নেই।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাংলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অবস্থান করেছেন ধর্ষণ ও অস্ত্র মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান। তার দখলে থাকা ওই বাংলো থেকেই শুক্রবার রাতে একটি পাইপগান, চারটি রামদা, একটি ছুরি ও দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শাহপরান থানা পুলিশের এসআই মিল্টন সরকার বাদী হয়ে সাইফুরকে একমাত্র আসামি করে অস্ত্র আইনে মামলা করেন।

করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের নির্দেশনা অনুসারে এমসি কলেজ বন্ধ থাকলেও ছাত্রাবাস খোলা ছিল। ছাত্রাবাসে শুধু সাইফুর নয়; ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক জামাল উদ্দিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছাত্রাবাসে অবৈধভাবে থাকতেন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। সাইফুর রহমান কলেজের নিয়মিত ছাত্র না হওয়া সত্ত্বেও তাকে ছাত্রাবাসের অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের কর্মীরা নানা ধরনের উৎপাত করলেও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন নীরব।

এরই মধ্যে গণধর্ষণের ঘটনায় করা মামলার এক নম্বর আসামি ছাত্রলীগকর্মী সাইফুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার এড়াতে নিজের চেহারায় পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। ধরেন ছদ্মবেশ। তার মুখে দাড়ি না থাকায় অবাক হন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা।

রোববার পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর দেখা যায় সাইফুরের মুখে দাড়ি নেই। দুদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর পর রোববার সকালে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সাইফুরকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়, সাইফুরের মুখে লম্বা দাড়ি থাকলেও গ্রেফতার এড়াতে দাড়ি কেটে ফেলেন। সেই সঙ্গে চুলও ছোট করে করেন তিনি। তবে ছদ্মবেশ ধরেও রক্ষা পাননি সাইফুর।

এর আগে সকাল ৬টার দিকে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকা থেকে মামলার চার নম্বর আসামি অর্জুন লস্করকেও গ্রেফতার করে সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ নিয়ে মামলার দুই আসামি গ্রেফতার হলো। দুজন আসামি সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেফতার সাইফুর বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে ও অর্জুন জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে।

শুক্রবার বিকেলে স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। সন্ধ্যায় তাদের কলেজ থেকে ছাত্রাবাসে ধরে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের ছয়-সাত নেতাকর্মী। এরপর দুইজনকে মারধর করা হয়। একই সঙ্গে স্বামীকে আটকে রেখে তার সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করেন তারা। খবর পেয়ে রাতে ছাত্রাবাস থেকে ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

রোববার দুপুরে সিলেটের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২২ ধারায় ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে জবানবন্দি দেন নির্যাতিত গৃহবধূ। এরপর তাকে আবার হাসপাতালে নেয়া হয়।

এ ঘটনায় শনিবার ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন গৃহবধূর স্বামী। পুলিশ রোববার সকালে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সাইফুর রহমান ও হবিগঞ্জের মাধবপুরের মনতলা থেকে অর্জুন লস্করকে গ্রেফতার করে। তারা দুজনই সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ছামির মাহমুদ/এএম/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]