ঝুপড়িতে থেকেও আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমি দান করলেন বৃদ্ধা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নাটোর
প্রকাশিত: ০৯:৪৪ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০২০

নাম তার ঝুরন। কাগজে-কলমে ঝুরমান বেওয়া। বয়স তেষট্টির কোটায়। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগরের কৈচরপাড়ার মৃত কছিম উদ্দিনের মেয়ে তিনি। এক ভাই ও তিন বোনের মধ্যে বড় ঝুরমান বেওয়া। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরপরই তার বিয়ে হয় নাটোর সদরের লক্ষ্মীপুর গ্রামের হাতেম আলীর সঙ্গে।

সুদর্শন হাতেম আলী নিজের সুন্দর চেহারাকে পুঁজি করে একের পর এক বিয়ে করতে থাকেন। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই ভেঙে যায় ঝুরমান বেওয়ার সংসার। সাত মাস বয়সী একমাত্র ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে তার আশ্রয় হয় দরিদ্র বাবার ঘরে। বাবার মৃত্যুর পর অভাবের তাড়নায় তিনি নওগাঁর সান্তাহার থেকে মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও মাদুর কিনে এনে এলাকায় বাড়ি বাড়ি ফেরি করে বিক্রি করতেন। এক সময় ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করে মাকে ফেলে চলে যায় শ্বশুরবাড়িতে।

বয়স বাড়ায় শরীরের শক্তি কমে আসে ঝুরমান বেওয়ার। বন্ধ হয়ে যায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরি করা। এখন তিনি মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। তার কোনো ঘরবাড়ি নেই। এখনও বসবাস করেন ভাইয়ের জমিতে করা একটি ঝুপড়ি ঘরে। বিধবা বোন জরিনা বেওয়ার ঘরের পাশেই তার ঘর।

ঝুরমান বেওয়া জানান, ১৯৯১ সালে সরকার তার আবেদনে সাড়া দিয়ে বাবার বাড়ি জামনগর মৌজায় ৯৭ শতাংশ খাস জমি বন্দোবস্ত করে তাকে দলিল করে দেয়। প্রভাবশালীদের চাপ, নিজের অভাব-অনটন এবং অক্ষরজ্ঞান না থাকায় সেই জমি ভোগ করতে পারেননি তিনি। শেষ বয়সে জমিটুকু প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে দান করার ইচ্ছা হয় তার। সেখানে যাতে তার মতো গৃহহীন আরও অনেক পরিবারের একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়।

jagonews24

শনিবার (১৪ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে ৮০ শতাংশ জমি সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেয়ার কাগজপত্র হস্তান্তর করেন ঝুরমান বেওয়া। বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রিয়াঙ্কা দেবী পাল জমির প্রয়োজনীয় দলিলাদি গ্রহণ করেন।

দলিল হস্তান্তরের সময় জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস, উপজেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা, জামনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি লোকমান হাকিম, জামনগর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইউসুফ আলী, বাঁশবাড়িয়া ভূমিহীন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোত্তালেব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমি হস্তান্তর করে খুশি বৃদ্ধা ঝুরমান বেওয়া। ঝুরমানের চাওয়া- দীর্ঘদিন ধরে তার বিধবা বোন জরিনা ঝুপড়ি ঘরে থাকছেন। তার দেয়া জমিতে ঘর নির্মাণ হলে তার বোনের জন্য যেন একটি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়।

এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াঙ্কা দেবী পাল বলেন, ঝুরমান বেওয়ার এ অবদান দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিজে গৃহহীন হয়েও গৃহহীন আরও ৪০ জনের ঘর নির্মাণের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমি হস্তান্তর করছেন। তিনি যেহেতু নিজেই গৃহহীন সে কারণে তার ৯৭ শতাংশ জমির মধ্যে ৮০ শতাংশ দান করার পর যে ১৭ শতাংশ অবশিষ্ট থাকবে সেই জমিতে তাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে। এছাড়াও আশ্রয়ণ প্রকল্পে তার বিধবা বোন জরিনাকেও একটি ঘর বরাদ্দ দেয়া হবে।

রেজাউল করিম রেজা/আরএআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]