বড় ভাই পুলিশে ধরিয়ে দেয়ায় দেড় যুগ পর নির্মম প্রতিশোধ ছোট ভাইয়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৮:৫১ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০২০

পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়ার ঘটনার প্রায় দেড় যুগ পর বড় ভাই ও ভাবিকে নির্মমভবে কুপিয়ে প্রতিশোধ নিলেন ছোট ভাই।

শনিবার (২৮ নভেম্বর) রাতে বরিশালের হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িযা ইউনিয়নের পূর্ব কোড়ালিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বড় ভাই দুলাল বাবুর্চির (৫৬) বাম পা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন ছোট ভাই নুরু বাবুর্চি (৪৫)।

ভাবি নিলুফা বেগমের (৩২) অবস্থাও গুরুতর। তাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

দুলাল বাবুর্চি ও হামলাকারী নুরু বাবুর্চি ওই এলাকার মৃত হাসেম বাবুর্চির ছেলে।

নুরু বাবুর্চির বিরুদ্ধে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক, ধর্ষণচেষ্টা, মারামারিসহ অসংখ্য মামলা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে তিনি একটি অস্ত্র মামলায় ১৪ বছর সাজা খেটে কারাগার থেকে মুক্ত হন। এরপর গত চার বছরে অন্তত ২৫ জনকে কুপিয়ে আহত করেছেন। এর মধ্যে কয়েকজনকে হাত বা পা হারাতে হয়েছে। চার মাস আগে আপন চাচাতো ভাই কাঞ্চন বাবুর্চিকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে আহত করেন। কাঞ্চন বাবুর্চি বেঁচে গেলেও তিনি পঙ্গু। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে নুরু বাবুর্চিকে গত চার বছরে বারবার জেলে যেতেও হয়েছে। কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে একইভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন।

নুরু বাবুর্চির স্বজনরা জানান, ছোটবেলা থেকেই দুষ্টু প্রকৃতির ছিলেন নুরু বাবুর্চি। কেউ কিছু বললে তার মুখের বদলে হাত চলত। ২০ বছর বয়সে নুরু বাবুর্চি উপজেলার কাউরিয়া বাজারে শত শত মানুষের সামনে তার চাচাশ্বশুরের কান কেটে উল্লাস করেন। এরপর ডাকাত দলের সঙ্গে যুক্ত হন নুরু বাবুর্চি। এরপর যতই দিন গেছে তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আরও বেড়েছে। নুরু বাবুর্চি গ্রামে এক আতঙ্কের নাম।

স্থানীয়রা জানান, পূর্ব কোড়ালিয়া গ্রামের মাওলানা নজরুল ইসলামের পরিবারের নারী সদস্যদের ওপর কুনজর পড়ে নুরু বাবুর্চির। তার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যান। তাছাড়া গ্রামে চাঁদাবাজি, ডাকাতি, হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত নুরু বাবুর্চি। কেউ মামলা বা তার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিলে হামলা চালানো হয়। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।

প্রায় দেড় যুগ আগে নুরু বাবুর্চির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পেয়ে গ্রামে একদল পুলিশ আসে। এ সময় পুলিশ তার বড় ভাই দুলাল বাবুর্চির কাছে নুরু বাবুর্চির ঠিকানা জানতে চায়। দুলাল বাবুর্চি পুলিশকে তার ছোট ভাই নুরু বাবুর্চির বাড়ি দেখিয়ে দেন। পরে নুরু বাবুর্চিকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে পুলিশ।

আদালত নুরু বাবুর্চিকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। জেলে থাকার সময় বড় ভাই দুলাল বাবুর্চি তার ঠিকানা বলে দেয়ার বিষয়টি জেনে যান নুরু বাবুর্চি। পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় বড় ভাইকে হত্যার প্রতিজ্ঞা করেন তিনি।

প্রায় চার বছর আগে তিনি ওই অস্ত্র মামলায় ১৪ বছর সাজা খেটে কারাগার থেকে মুক্ত হন। এরপর বড় ভাই দুলাল বাবুর্চিকে হত্যা করতে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এর মধ্যে গ্রামের বেশ কয়েকজন প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন নুরু বাবুর্চি। বিবাদের জেরে গত চার বছরে অন্তত ২৫ জনকে তিনি কুপিয়ে আহত করেন। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে গত চার বছরে কয়েকবার জেলে যেতেও হয়েছে। এসব কারণে তার প্রতিশোধ নেয়া হয়নি।

মাসখানেক আগে জেল থেকে বের হয়ে বড় ভাই দুলাল বাবুর্চিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন নুরু বাবুর্চি। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৮টার দিকে বড় ভাই দুলাল বাবুর্চির ওপর হামলা চালানো হয়।

স্থানীরা জানান, দুলাল বাবুর্চি মোটরসাইকেলযোগে উপজেলার কাউরিয়া বাজার থেকে নিজ বাড়ি যাচ্ছিলেন। বাড়িতে প্রবেশের সড়কে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা তার ছোট ভাই নুরু বাবুর্চি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। এ সময় নুরু বাবুর্চির তিন ছেলে ও কয়েকজন সহযোগীও ছিলেন। এতে দুলাল মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার বাম পা কুপিয়ে প্রায় বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ সময় দুলালের স্ত্রী নিলুফা বেগম স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাকেও কুপিয়ে জখম করেন নুরু। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।

এ বিষয়ে হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অসীম কুমার সিকদার বলেন, ‘শনিবার রাতের ঘটনার পর একদল পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে নুরু বাবুর্চিসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের এলাকায় পাওয়া যায়নি। রোববার দুপুরেও পূর্ব কোড়ালিয়াসহ আশপাশের গ্রামে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। তাদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।’

তিনি আরও জানান, নুরু বাবুর্চির বিরুদ্ধে ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। কয়েক মাস আগেও তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। জামিনে বের হয়ে এলাকায় আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানান ওসি।

সাইফ আমীন/এসআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]