‘আয় কম হোক তবু সন্তান বাড়িতে থাকাই ভালো’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:৪২ এএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

শুক্রবার (২২ জানুয়ারি) ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১টা বেজে ১০ মিনিট। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের বারান্দায় বসে ঝিমুচ্ছেন রতন আলী। বেঞ্চের একপাশে হাত দিয়ে ধরে রেখেছেন, যাতে করে ঘুমের ঘোরে পড়ে না যান। চোখদুটো জবা ফুলের মতো টুকটুকে লাল হয়ে উঠেছে। পরনে লুঙ্গি, গায়ে জ্যাকেট। কানে মাফলার জড়ানো।

স্ত্রী শাহানাজ বেগমকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন রতন আলী। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মেরিগাছা থেকে রাত ১০টায় পাড়ি দিয়ে কুয়াশা ভেদ করে পৌঁছেছেন ১২টায়। হঠাৎ স্ত্রীর পেটে জ্বালাপোড়া শুরু হলে বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করান। অবস্থা বেগতিক দেখে চিকিৎসকরা পাঠিয়ে দেন রাজশাহীতে। প্রাথমিক চিকিৎসা পেয়ে কিছুটা শান্ত হয়েছেন তার স্ত্রী। এতে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বারান্দার বেঞ্চে বসে ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করছেন তিনি।

রতন আলীর বয়স ৫০ পেরিয়েছে। চুল-দাড়িতে পাক ধরেছে। খোঁচা-খোঁচা গোফের আড়ালে আফসোসের ভাষা স্পষ্ট। শিল্পী নচিকেতার গানের সঙ্গে যেন মিলে গেছে জীবন। দুই সন্তান বিদেশে থাকেন। রোজগার করে প্রতিষ্ঠিত তারা। দেশে অসুস্থ হয়ে মা হাসপাতালে ভর্তি। অসুস্থ বয়স্ক বাবা একবার মেডিকেলের ওয়ার্ডে আবার কখনো ওষুধের স্টোরে ছুটছেন। যে করেই হোক স্ত্রীকে বাঁচাতে হবে।

জীবনের পাড়ি দেয়া দিনগুলো রতন আলীর ঘুম জড়ানো চোখে ভেসে ওঠে। তিনি জানান, বড় ছেলেকে পুলিশের চাকরি পাইয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছিলেন। দুই লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে যখনই সাত লাখ টাকায় চাকরির বন্দোবস্ত হয়, ঠিক তখনই দালাল উধাও। চাকরি না হওয়ায় সেই টাকায় বড় ছেলে রওশন আলমকে (২৩) মালয়েশিয়ায় শ্রমিক হিসেবে পাঠিয়ে দেন। কেটে যায় সংসারের টানাপোড়েন।

এর দু’বছরের মাথায় উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ুয়া ছোট ছেলে শামীম হোসেন (১৮) কিশোর বয়সের গোলকধাঁধাঁয় হারিয়ে যেতে বসে। আবেগ ও জেদের বশবর্তী হয়ে এক মাসের মধ্যেই প্রেমিকার কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এমনটা না হলে আত্মহত্যা করবেন বলে জানান। লেখাপড়ার চেয়ে সন্তান বেঁচে আছে সেটাই বড় কথা। তাই বড় ছেলের দেয়া টাকা আর জমি বিক্রির টাকায় পড়াশোনা ছাড়িয়ে তাকে পাঠিয়ে দেন কাতারে।

বর্তমানে তারা দুই ভাই থাকেন দেশের বাইরে। ছোট বোনের বয়স মাত্র ৮ বছর। মায়ের সঙ্গে সেও হাসপাতালে এসেছে। কিন্তু অনেক ছোট হওয়ায় বাবাকে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারছে না সে।

পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে রতন আলী বলেন, ‘ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় হঠাৎ ছেলে একদিন বলল, এক মাসের মধ্যে বিয়ে দাও, নাহলে বিদেশ পাঠাও। কিছুই বুঝতে পারলাম না। বিদেশ না পাঠাতে পারলে আত্মহত্যা করবে। তাই ছোট ছেলেকে কাতার পাঠালাম। এখন দুই ছেলে বিদেশ থাকে, টাকা পাঠাই মাসে ৭০ হাজার। আর আমি হাসপাতালে তাদের মাকে নিয়ে অসহায়।’

দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে ভুল করেছেন বলে আফসোস প্রকাশ করেন রতন আলী। অনুশোচনার সুরে বলেন, ‘দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে এখন মাসে ৭০ হাজার টাকা আয় হয়। বড় ছেলে পাঠায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার, ছোট ছেলে ৩০ হাজার। জমি বিক্রি করেছিলাম, এখন জমি কিনছি। সুখের দেখা মিলতে না মিলতেই হাসপাতালের বেডে। এজন্যই বলব, আয় একটু কম হোক তবুও ছোট ছেলেকে বাড়িতে রাখা উচিত ছিল।’

হাসপাতাল থেকে রোগীর পাশাপাশি স্বজনরা গরম কাপড় বা কম্বল পাওয়ার সুযোগ থাকলে শত শত মানুষকে কষ্ট লাঘব হতো বলে মন্তব্য করেন রতন আলী। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে মানুষ বিপদে পড়ে আসে। হাসপাতাল থেকে একটা করে কম্বল দিলে কতই না ভালো হতো! বড়াইগ্রাম হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে যারা যায় তাদের একটা করে কম্বল দেয়া হয়, আবার নিয়ে নেয়। রাতে শীতের মধ্যে এই বেঞ্চে বসে থাকা যায়? হাসপাতালে এরকম একটা ব্যবস্থা নেই। আবার রোগী রাখার জায়গা নেই। সিট কম থাকায় মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। হাসপাতালকে আরও উন্নত করা দরকার।’

এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]