মনিরুল রহিমার মতো ১৫৫৬ গৃহহীনের স্বপ্ন পূরণ করলেন শেখ হাসিনা

সাইফ আমীন
সাইফ আমীন সাইফ আমীন , নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০২:৫৯ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মনিরুল ইসলাম (৪৮)। এক চোখে মাত্র কয়েক হাত দূর পর্যন্ত আবছা ছায়ার মতো দেখতে পান। অসচ্ছল পরিবারে জন্ম নেয়ায় শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মনিরুল। পরিবারের সদস্যদের দু’মুঠো খাবার জোগাড়ে যখন যে কাজ পেয়েছেন, করেছেন। মনিরুল ইসলামের স্ত্রী জাহানারা খানমও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।

এই দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে জাহিদুল ইসলামও জন্মান্ধ। সংসারে নিত্যঅভাব, তারপরও বহু কষ্টে সংসারের হালধরে রেখেছেন।

মনিরুল ইসলাম তার পরিবার নিয়ে থাকতেন বরিশালের সদর উপজেলার উত্তর লামছড়ি গ্রামের পৈত্রিক ভিটায়। জরাজীর্ণ টিনের দোচালা একটি ঘরে ছিল তাদের বসবাস। সামান্য বৃষ্টি হলে চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ত। সন্তানদের নিয়ে সারারাত জেগে থাকতেন। টাকার অভাবে ঘর মেরামত করার সামর্থ্য ছিল না।

মনিরুল ইসলাম স্বপ্ন দেখতেন লেখাপড়া করে দুই ছেলে ভালো চাকরি করবে। তাকে কাজ করতে হবে না। সংসারে থাকবে না অভাব- অনটন। আর জরাজীর্ণ ঘরটির জায়গায় নির্মাণ হবে পাকা দালান। কিন্তু হঠাৎ করে সব এলোমেলো হয়ে গেল। গতবছর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মনিরুল ইসলামের বসতভিটা ও ৩০ শতাংশ ফসলি জমি কীর্তনখোলা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে অন্ধকার জীবনে বাড়তে থাকে আঁধারের গাঢ়তা।

পরিবারের সদস্যদের দু’মুঠো খাবার জোগাড়ে যেখানে তাকে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে জমি কিনে ঘর বানানো তার কাছে অসাধ্য ব্যাপার। বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর তার স্ত্রী দুই ছেলেকে নিয়ে আশ্রয় নেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। আত্মীয়ের বাড়িতে বেশিদিন থাকার উপায় নেই। কারণ আত্মীয়-স্বজনদের অবস্থা অনেকটাই তাদের মতো। তাদের সংসারেও অভাব-অনটন। তাই কিছুদিন পরপর এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

মনিরুল ইসলামের আশ্রয় হয় জাতীয় অন্ধ সংস্থার বরিশাল জেলা শাখার কার্যালয়ে। রাতে কাজ শেষ করে সবাই চলে গেলে ওই অফিসের মেঝেতে ঘুমানোর সুযোগ হয় তার।

barisal2

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমান

এভাবে বসবাসই যখন তার পরিবারের নিয়তি ভাবা শুরু করলেন, তখন উপজেলা প্রশাসন সহায়তার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল। মুজিববর্ষে বাংলাদেশের একজনও মানুষ গৃহহীন থাকবে না, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জমিসহ টিনের ছাউনি দেয়া পাকা ঘর পেয়েছেন তিনি। ঘর পেয়ে খুশির জোয়ারে ভাসছে মনিরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘর না থাকায় গত একবছর স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এখন আর আলাদা থাকা লাগবে না। থাকার জায়গা নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই। এ আনন্দের কথা আমি কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। আজকের দিনটি আমার জন্য স্মরণীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কল্যাণে ঘর পেয়েছি। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা নেই।’

মনিরুল ইসলামের মতো ঘর পেয়েছেন সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকার রহিমা বেগম (৫০)। তার জীবন সংগ্রামের গল্প আরও করুণ। বাবার সংসারে অভাব-অনটনের কারণে কিশোরী বয়সে তার বিয়ে দেয়া হয়। স্বামী ইউনুস গাজীর এক সময় চরবাড়িয়া এলাকায় ভিটেবাড়ি ও ফসলি জমি ছিল। নিজের জমিতে চাষাবাদ ও ছোটখাটো ব্যবসা করে তাদের সংসার ভালোই চলছিল।

চার মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল তাদের। এভাবেই কেটে যায় প্রায় দুই যুগ। এরই মধ্যে অনুষ্ঠান করে চার মেয়েকে বিয়ে দেন।

বছর দশেক আগে তাদের সংসারে শনি ভর করে। স্বামী ইউনুস গাজী ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তার চিকিৎসার খরচ চালাতে কৃষিজমি বিক্রি করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে চিকিৎসা। চিকিৎসা চালাতে গিয়ে রহিমা বেগম তার গয়না এবং জমানো সব টাকা খরচ করে ফেলেন। সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। এরপর অভাব-অনটন বেড়েছে ক্রমশ। সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পরে তার কাঁধে। মানুষের বড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন। মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে দুই বেলা দুমুঠো খাবার জুটতো না তদের। মায়ের কষ্ট দেখে দুই ছেলে দিন মজুরিতে কাজে নেমে পড়েন।

এসবের মধ্যেই তাদের বসতবাড়িটি নদীভাঙনের কবলে পড়ে। কয়েক বছরের মধ্যে রাক্ষুসে নদী বসতবাড়িসহ আশপাশের জমি গিলে ফেলে। সব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি। একমাত্র বসতঘরটি হারিয়ে সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে গ্রামের এক ব্যক্তির বাড়ির বাগানে টিন দিয়ে ঘর তুলে বসবাস করছিলেন। জমির মালিকের বাড়ি দেখাশোনা ছাড়াও প্রতিমাসে ৫০০ টাকা করে দিতে হতো রহিমা বেগমকে। এর পরের ঘটনা অনেক করুণ।

প্রায় দুই মাস আগে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয় রহিমা বেগমের পরিবারকে। গত ১৯ নভেম্বর তাদের থাকার ঘরটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে অল্পের জন্য রহিমা বেগম ও তার স্বামী ইউনুস গাজী রক্ষা পেলেও মেয়ের ঘরের নাতি রেজাউল (৮) আগুনে পুড়ে মারা যায়। ঘরে যেটুকু মালামাল ছিল সবই পুড়ে যায় ওই আগুনে। অগ্নিকাণ্ডের পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা সাহায্য করা হয়েছিল। পাশাপাশি একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। অবশেষে একটি পাকাঘর পেয়েছেন রহিমা বেগম।

barisal2

রহিমা বেগম বলেন, ‘অনেক কষ্টে ছিলাম আমরা। খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে অনেক দিন পার করতে হয়েছে। একটি পাকাঘর পেয়ে আমার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই খুশি। শুনেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘর উপহার দিয়েছেন। স্বপ্নেও ভাবিনি ঘর পাব। তার জন্য অনেক দোয়া করি। আল্লাহ তারে সুখে রাখুক।’

দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত বিধবা রঞ্চিতা বেপরীর (৫৫) জীবন সংগ্রামের কাহিনিও প্রায় অভিন্ন। সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকায় বসবাসকারী রঞ্চিতা বেপরী স্বামীকে হারিয়েছেন অনেক আগেই। তার ২ ছেলে ও ১ মেয়ে। সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর পর দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। উলট-পালট করে দেয় সব হিসাব-নিকাশ। স্বামী চিত্ত রঞ্জন বেপারী মারা যাওয়ায় কিছুটা ভেঙে পড়েন। এরপর শুরু হয় সন্তানদের নিয়ে বেচে থাকার লড়াই। কখনো হোগল পাতা দিয়ে পাটি তৈরি, কখনো মাছ ধরে, কখনো গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোমতে তার সংসার চলে।

তাদের সম্পদ বলতে ছিল নদীর কূল ঘেঁষে ৩ শতাংশ জমি ওপর বসতবাড়িটি। রঞ্চিতা বেপরীর বসতভিটার কোনো চিহ্নই নেই এখন। কয়েক বছর আগে ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এরপর নদীর তীরে অন্যের জমিতে সন্তানদের নিয়ে ছাপরা ঘর তুলে থাকছেন তিনি। সেই জরাজীর্ণ ঘরটিই কোনোরকম মাথাগোঁজার আশ্রয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছিদ্র দিয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে বসে থাকতে হয়। এছাড়া বর্ষাকালে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে তার ঘরে। উপজেলা প্রশাসন তার কষ্ট-সংগ্রামের কথা জানতে পেরে জমিসহ একটি পাকাঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

রঞ্চিতা বেপরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল একটা ছোট্ট জমি কিনে ঘর বানাবো। দু’বেলা খাবারই জোটে না, সেখানে জমি কিনে ঘর বানানো ছিল অবাস্তব ব্যাপার। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমার নিজের পক্ষে কখনো এমন বাড়ি বানানো সম্ভব হতো না। ঘর পেয়ে আমার ছেলেমেয়ে দারুণ খুশি।’

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমান জানান, মুজিববর্ষে বাংলাদেশের একজনও মানুষ গৃহহীন থাকবে না, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নগরীসহ সদর উপজেলার মোট এক হাজার ৫৭টি গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারকে জমি ও ঘর দেয়া হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে দুই শতাংশ জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘর দুই রুমের। সঙ্গে রয়েছে রান্নাঘর, বারান্দা, বাথরুম। এসব ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। সুপেয় পানির জন্য থাকছে ১৮ গভীর নলকূপ।

তিনি বলেন, ‘কয়েকটি ধাপে প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীন বাছাই করা হয়েছে। এরপর পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার জন্য চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা গৃহহীন ও ভূমিহীনদের বিষয় খোঁজ নিয়েছেন। পরে প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীনদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আজ তাদের হাতে জমির দলিল তুলে দেয়া হয়েছে। একটি ভালো ঘর তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। ঘর পেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে খুশি বন্যা বয়ে গেছে। তাদের চোখে-মুখে যে আনন্দ দেখেছি, সেই অনুভূতি বলে প্রকাশ করা যাবে না। এ স্মৃতি সারাজীবন মনে থাকবে আমার।’

বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, ‘মুজিববর্ষ উপলক্ষে জেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীন ১ হাজার ৫৫৬টি পরিবার ঘর পেয়েছে। নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী ভালো মানের উপাদান দিয়ে জেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গৃহহীনদের জন্য প্রতিটি ঘর বানানো হয়েছে। খাসজমিতে প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। জেলায় এক হাজার ৫৫৬টি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা।’

সাইফ আমীন/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]