দিন বদলের ধারায় ‘গাড়িয়াল ভাই’র পেশা বদল

জিতু কবীর জিতু কবীর , নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর রংপুর
প্রকাশিত: ০২:২৩ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

রঙ্গরসে ভরপুর ‘রংপুর’। তিস্তা, ধরলা আর ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা রংপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতি ঘিরে রয়েছে নানা গৌরবময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ইতিহাস। বিশেষ করে এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি অনবদ্য।

এ লোকসংস্কৃতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাওয়াইয়া গান। উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাওয়াইয়া সঙ্গীতধারা। ভাওয়াইয়া গান মানেই ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতীক সেই ‘গরুর গাড়ি’ এবং ‘গাড়িয়াল ভাই’।

‘ও কি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে’ কিংবা ‘ধিকো ধিকো ধিকো মইষাল রে, আরে ও মইষাল ধিকো তোমার হিয়া’ ‘নাইওর আর না যাইম গাড়িয়াল তোমার গাড়িত চড়ি’-গানগুলো এখনো সমাদৃত। এ অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসায় এখনো জড়িয়ে আছে ‘গরুর গাড়ি’ ও ‘গাড়িয়াল ভাই’।

লোকসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ আব্বাস উদ্দীনের সেই প্রাণজুড়ানো গান মাঝে মধ্যে পথে-প্রান্তরে বেজে উঠলেও কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গরুর গাড়ি-গাড়িয়াল ভাই। তিন দশক আগেও এ অঞ্চলের প্রতিটা গৃহস্থ পরিবারেই কম-বেশি গরুর গাড়ি দেখা যেত। একটু দূরের পথে যেতে হলে কিংবা বিয়ে বাড়িতে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যেতে হলে গরু বা মহিষের গাড়িই ছিল চলাচলের অন্যতম বাহন। সেই সঙ্গে মাঠ থেকে জমির ফসল আনতে কিংবা হাটে বিক্রি করতে নিয়ে যাওয়ার জন্য গরু-মহিষের গাড়িই ছিল একমাত্র উপায়।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে ধীরে ধীরে গরুর গাড়ির জায়গা দখলে নিয়েছে সভ্যতার নানা বাহন। দিনবদলের ধারায় গরুর গাড়ির জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে রিকশা, ভ্যান, ট্রাক্টর, ট্রলিসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক বাহন। এসব বাহন ও কলকারখানায় যুক্ত হয়ে পেশাও বদলে ফেলেছেন এক সময়ের প্রেমিকপুরুষ ‘গাড়িয়াল ভাই’। এখন আর বিয়ে বাড়িতে বরযাত্রী হয়ে যাওয়ার বাহন সেই গরুর গাড়ি নেই। নারীরাও নাইওর হয়ে গরুর গাড়িতে চড়ে এখন আর যান না বাবার বাড়ি।

ফেলে আসা সেই গরুর গাড়ি, গাড়িয়াল আর নাইওরকে তবুও পিছু টানে অনেকের। তেমনি এক দম্পতি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ৭ নম্বর লতিফপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আব্দুস সামাদ ও মনোয়ারা বেগম।

গরুর গাড়িতে চড়ে বাবার বাড়ি থেকে বউ হয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়ি এসেছিলেন মনোয়ারা। ৭-৮ কিলোমিটার দূরত্বের স্মৃতি ভুলতে পারেননি ৩০ বছরেও।

মনোয়ারা বলেন, ‘আমার স্বামীর গরুর গাড়ি ছিল। সেই গরুর গাড়ি নিয়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন। প্রায় ৩০ বছর আগে গরুর গাড়িতে চড়ে শ্বশুরবাড়ি আসার সেই স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন সময় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও যাওয়ার সময় চারদিকে ঘেরা (ছই) গরুর গাড়ি ব্যবহার করতাম। মনে হয়, সেই আগের দিনগুলোই ভালো ছিল।’

বাপ-দাদার আমল থেকে গরুর গাড়ি ব্যবহার করলেও বছরখানেক আগে হাল ছেড়ে দিয়েছেন গাড়িয়াল ভাই আব্দুস সামাদ। পাঁচ দশক ধরে গাড়ি আর গরুর সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়েছিলেন তা আজ নেই।

গরুর দাম বেশি আর আধুনিক সভ্যতার বিভিন্ন যানবাহনের কারণে শেষ পর্যন্ত মাঠের ফসল সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত একমাত্র বাহন গরুর গাড়িটি বন্ধ করে দেন আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, ‘নিজের প্রয়োজনে গরুর গাড়ি ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতাম। আধুনিক যুগে এখন আর গরুর গাড়ি চলে না। এখন যান্ত্রিক বাহন পাওয়া যায়। দাম বেশি এবং চুরির ভয়ে গরু বিক্রি করেছি। গরু নেই, তাই গাড়িও আর ব্যবহার হয় না।’

jagonews24

সচরাচর এখন আর গরুর গাড়ি চোখে পড়ে না। প্রত্যন্ত কিছু এলাকায় দু-একটা গরুর গাড়ির দেখা মিললেও তা কেবল ব্যবহৃত হচ্ছে নিজেদের উৎপাদিত ফসল সরবরাহের কাজে। এছাড়া এ অঞ্চলের চরাঞ্চরগুলোতে স্বল্প আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি।

বাপ-দাদার ঐহিত্য এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন তেমনি একজন উপজেলার ৮নং চেংমারী ইউনিয়নের ধোপাকল গ্রামের কৃষক মনোয়ার হোসেন। সবক্ষেত্রে ব্যবহার না হলেও কেবল নিজের জমির ফসল ঘরে আনতে এবং হাটে যাওয়ার জন্য এখনো ব্যবহার করছেন গরুর গাড়ি।

প্রায় ৩২ বছর আগে ওই পাড়ার ১৬টি গরুর গাড়ি নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরে বিয়ে করতে গেলেও এখন তার মতো কেবল প্রতিবেশী মমদেল ও সেকেন্দারের রয়েছে একটি করে গাড়ি।

মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিয়ের সময় গরুর গাড়িতে করে বউ আনতে গিয়েছিলাম। জমি থেকে ধান-পাট, আঁখ নিয়ে আসতাম গরুর গাড়িতে। এছাড়া নাইওরি নিয়ে যেতাম। এখন নাইওর বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া না হলেও মাঠ থেকে ফসল আনতে গরুর গাড়ি ব্যবহার করছি। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ছিল, আগামীতেও ধরে রাখব।’

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের পূর্ব ইচলি গ্রামের কৃষক সাদেকুল ইসলাম। পূর্বপুরুষরা গরু-মহিষের গাড়ি ব্যবহার করলেও তিনি ব্যবহার করছেন ঘোড়ার গাড়ি। চরের ফসল আনা-নেয়াসহ বিভন্নজনের মালামাল পরিবহনের কাজে ভাড়ায় ঘোড়ার গাড়ি কাজে লাগান। তার মতো ৮-১০টি ঘোড়ার ও দুটি মহিষের গাড়ি এখন পূর্ব ইচলিসহ তিস্তার চরাঞ্চলে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জানতে চাইলে সাদেকুল বলেন, ‘আগে মানুষের গরু ছিল বেশি। তাই গাড়িও ছিল বেশি। গরুর দাম বেশি হওয়ায় এখন মানুষ গরু বা মহিষের গাড়ির প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘৩০-৩৫ হাজার টাকা হলে একটি ঘোড়া পাওয়া যায়। গরুর গাড়িতে দুটো গরু লাগে। দুটো ভালো গরু কিনতে হলে ৭০-৮০ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়।’

মিঠাপুকুর উপজেলার ৮নং চেংমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রেজাউল কবির টুটুল বলেন, ‘একটা সময় আমাদের মেঠোপথ ধরে ধান, পাট, আখসহ বিভিন্ন ফসল পরিবহন করা হতো এবং গ্রামবাংলার মানুষের পরিবহনের একটা মাধ্যম ছিল গরুর গাড়ি। আমাদের গ্রাম বাংলার এই ঐহিত্য গরুর গাড়ি আজ বিলুপ্তির পথে। গ্রামবাংলার প্রাচীন এই ঐহিত্য যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য আমরা চাই, আমাদের সেই ঐতিহ্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ধারণ করা হোক।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিককর্মী উমর ফারুক বলেন, মানুষের প্রয়োজনেই বিনির্মিত হয় সভ্যতা। সময়ের পরিক্রমায় সেই সভ্যতার গায়েও পরিবর্তনে ছোঁয়া লাগে, বদলে যায়। যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতা, ঐতিহ্য। গরুর গাড়ি ও গাড়িয়াল ভাই রংপুর অঞ্চলের একটি অতিপরিচিত ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। যান্ত্রিক সভ্যতা ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই ই ঐতিহ্য হারাতে বসেছি। যে সভ্যতা, যে ঐতিহ্য মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে বিনির্মাণ করেছে, সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য মানুষকে কখনো বাধ্য করা যাবে না। আবার তা ধরেও রাখতে হবে। ফলে বিলুপ্তপ্রায় এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ অতি জরুরি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রংপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে গরুর গাড়ি, ভাওয়াইয়া গান। এ অঞ্চলের ইহিতাস লিখতে গেলে উঠে আসবে গরুর গাড়ি, গাড়িয়াল ভাই ও ভাওয়াইয়া গান।

তিনি বলেন, এ ঐহিত্য ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া যারা এখানো এটা ধরে রেখেছেন তাদেরকে প্রণোদনার আওতায় আনা গেলে এটা পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না বলে মনে করি। তা নাহলে এ ঐতিহ্য কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।

জিতু কবীর/এসআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]