ঠেলে ঠেলে চলছে ঠেলাগাড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা
প্রকাশিত: ০৬:২৯ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

উন্নত প্রযুক্তি আর যোগাযোগ ব্যবস্থা আমাদের যেমন সামনের দিকে অগ্রসর হতে সুবিধা করে দিয়েছে, তেমনি কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের পরিশ্রম কমেছে, একইভাবে কর্মসংস্থানও কমেছে। ফলে এক দশক আগের পেশাও পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। তেমনই একটি পেশা ঠেলাগাড়ি চালানো।

বাসাবাড়ির মালামালা আনা-নেয়া, স্বল্প দূরত্বে ভারী জিনিসপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম বাহন ঠেলাগাড়ি। সময়সাপেক্ষ হলেও কয়েক বছর আগেও এ বাহনটির বহুল প্রচলন ছিল খুলনায়। কিন্তু সেই ঠেলাগাড়িই এখন বিলুপ্তির পথে। মোটরচালিত ভ্যান, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, স্যালোমেশিনচালিত ট্রলি, মিনি ট্রাক দখল করে নিয়েছে ঠেলাগাড়ির জায়গা। ফলে জীবন-জীবিকার তাগিদে ঠেলাগাড়ি চালানোর পেশায় নিয়োজিত খুলনার কয়েক হাজার মানুষ এখন পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

এক দশক আগেও অসহায় গরিব মানুষ কোনো কাজ না পেয়ে শেষ অবধি ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবন নির্বাহ করতেন। অনেকে পৈতৃক পেশা হিসেবেও এটা গ্রহণ করেন। কিন্তু বাধ্য হয়ে আজ তারা চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।

নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের চানমারী এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন (৫৭)। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চালান ঠেলাগাড়ি। তিনি বলেন, ‘২০ বছরের বেশি সময় ধরে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সংসার চালাচ্ছি। যখন ঠেলাগাড়ি চালানো শুরু করেছিলাম, তখন অনেক আয় হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঠেলা (ঠেলাগাড়ি) চালাইছি। সংসারে ৯-১০ জন মানুষের ভরণ-পোষণ হয়েছে সেই আয়ে। কিন্তু এখন দিনের অধিকাংশ সময় বেকার বসে থাকা লাগে।’

আবুল হোসেন বলেন, এখন আর কেউ ঠেলাগাড়ি ভাড়া নিতে চান না। কারণ হিসেবে বলেন, এখন সবাই তাড়াতাড়ি কাজ সারতে চান। ঠেলাগাড়ির চেয়ে দ্রুত চলাচল করে ইজিবাইক, স্যালো মেশিনের ট্রলি, মিনি পিকআপ ও মোটরচালিত ভ্যান। কম সময় লাগে বলে অনেকেই এখন ঠেলাগাড়ির প্রতি অনীহা দেখান। বাধ্য হয়ে অনেক ঠেলাচালক ঠেলার পরিবর্তে ওইসব বাহন কিনে ব্যবসা শুরু করেন।

এক সময়ের শিল্প এলাকা রূপসার ঠেলাগাড়িচালক অহিদুল ইসলাম (৩৩) ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঠেলাগাড়ি চালান। স্বামী-স্ত্রীসহ পাঁচজনের সংসার। কিছুদিন আগেও ঠেলা চালিয়ে ভালোই আয় করতেন। কিন্তু এখন ঠেলার ট্রিপ কমে গেছে। সংসার চালাতে কষ্ট হয়। ঠেলা চালানোর শুরু থেকে ইট-বালি বহন করতেন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আগে দিনে ২০টির বেশি ট্রিপ পেলেও এখন তা কমে পাঁচ-ছয় এ ঠেকেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখন ঠেলায় আর কেউ ইট-বালি নিতে চায় না। সবাই চায় দ্রুততার সাথে কাজ করতে। তাই এখন ইট-বালি বহন করছে স্যালো ইঞ্জিনের ট্রলি, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান।’

অহিদুল বলেন, ‘যা-ও একটু কোনোরকম চলছিল, মহামারি করোনা এসে শেষ করে দিয়েছে। নগরীতে নির্মাণকাজ কমেছে, যা একটু আধটু হচ্ছে তা-ও ট্রলিতে করে অথবা মিনি ট্রাকে নেয়া ইট-বালি-সিমেন্ট দিয়েই। ঠেলাগাড়ির ট্রিপ এখন হাতেগোনা কয়েকটি মিলছে।’

৪০ বছরের বেশি সময় ধরে মাটি বহনের কাজ করছেন চানমারী এলাকার আবু হানিফ। শুধু মাটি পরিবহনের কাজ করেই এক সময় সচ্ছলতার মুখ দেখেছিলেন তিনি। জমি কিনে সেখানে বাড়িও করেছেন। কিন্তু এখন আর আগের মতো মাটি পরিবহন করতে পারছেন বলে জানান। আবু হানিফ বলেন, ‘এখন মাটির চেয়ে বালির ব্যবহার বেশি হচ্ছে। ডাম ট্রাকেই বালি কিনছেন সবাই। ফলে ঠেলাগাড়ির ব্যবহার এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।’

খুলনার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র বড় বাজার এলাকায় একসময় ঠেলাগাড়ি ছাড়া আর কোনো বাহন ছিল না। ঠেলাগাড়ির আধিক্য এতো বেশি ছিল যে, ব্যবসায়ীরাও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। কিছু কিছু সড়কে ব্যারিকেডও দেয়া হয়েছিল সেই সময়। কিন্তু সেই সড়কগুলো এখন দখল করে নিয়েছে ট্রাক, ট্রলি আর ইঞ্জিনচালিত ভ্যান। সে সময় ঠেলাচালকদের নিজেদের ইউনিয়নও ছিল। কিন্তু আজ সেই ইউনিয়ন বিলুপ্তপ্রায়।

বড় বাজার এলাকায় এক সময়ের ঠেলাচালক নাসির উদ্দিন জানান, এখন আর ঠেলাগাড়িতে মালামাল বহন করা হয় না। কদমতলা, বার্মাশিল, স্টেশন রোড এলাকায় এখনো যেসব ঠেলাগাড়ি চলছে, তা ১০ মিনিটের পথও নয়। ঠেলা চালিয়ে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।

খুলনার সবচেয়ে শ্রমঘন এলাকা তথা খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ২১ নম্বর ওয়ার্ডেই এই বাণিজ্য এলাকা। এই ওয়ার্ড থেকে বারবার নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শামসুজ্জামান মিয়া স্বপন মনে করেন ঠেলাগাড়ি কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট গাড়ি। তিনি বলেন, ‘আগে ঠেলাগাড়িতে ইট-বালি পরিবহন করা হতো। কিন্তু এখন বিক্রেতারা সরাসরি ট্রাক বা অন্য গাড়িতে মাল পাঠিয়ে দেন। কেউ এখন আর গায়ে খেটে কষ্ট করতে চান না। অনেকেই এখন ইঞ্জিনের ওপরই নির্ভরশীল।’

কাউন্সিলর স্বপন আরও বলেন, খুলনা সিটি করপোরেশন থেকে এখন ঠেলাগাড়ির লাইসেন্স দেয়া হয়। কেউ চাইলে তাকে ঠেলাগাড়ির লাইসেন্স প্রদান করবে কেসিসি।

আলমগীর হান্নান/এসআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]