অন্যের স্মার্টফোনে ঘাটতেন ইউটিউব, বানিয়ে ফেললেন প্রাইভেটকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর
প্রকাশিত: ০৬:০৫ পিএম, ১৬ এপ্রিল ২০২১

ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল গাড়ি বানানোর। অভাবের সংসারে ঘানি টানতে গিয়ে বাড়ির বড় ছেলে হয়ে পড়ালেখার পাঠ চুকাতে হয় প্রাথমিকের গণ্ডিতেই। বাবার সহযোগী হয়ে ক্ষেতে-খামারে কাজ করেন কিছুদিন। এরপর প্রায় ১৪ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমান রাজধানীতে। নিজের স্মার্টফোন ছিল না। তাই বলে তো আর অদম্য ইচ্ছে থেমে থাকতে পারে না। অবসরে সহকর্মীদের কাছ থেকে ফোন নিয়ে ইউটিউবে গাড়ি বানানোর ভিডিও দেখতেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সফলও হয়ে ওঠেন তিনি।

নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় দুই সিটের একটি প্রাইভেটকার বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিণী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কেশবপুর উত্তরপাড়ার কৃষক কফিল উদ্দিনের ছেলে সেলিম মিয়া (৩০)। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা ব্রিজ সংলগ্ন সামুদা কেমিক্যাল কোম্পানিতে এখন কাজ করেন তিনি।

গতবছর কোরবানি ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু করেন সেলিম। আর এ কাজে তার সহযোগী ছিলেন ছোটভাই মাদরাসাছাত্র নিয়ামুল ইসলাম। সেলিম সুযোগ পেলেই ছুটিতে বাড়ি এসে ছোটভাই নিয়ামুলকে নিয়ে গাড়ি বানানোর কাজ এগিয়ে নিতেন। অবশেষে এক বছরেরও কম সময়ে গাড়ি চালানোর উপযোগী করে সফল হয়ে ওঠেন এই দুইভাই।

মাসখানেক আগে নিজ গ্রামে এসে বাড়ি থেকে সেই গাড়ি চালিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে যান সেলিম। সেখানে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরাসহ উৎসুক মানুষের মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি হয় সেলিমের গাড়িটি। দৃষ্টিনন্দন লাল রঙের পরিবেশবান্ধব সেই গাড়িটি দেখতে সেলিমের বাড়িতে এখন ভিড় জমাচ্ছেন অনেকেই।

কৃষক কফিল উদ্দিনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় একমাত্র মেয়ে কল্পনা আক্তারের বিয়ে হয়েছে। এরপর সেলিম। দ্বিতীয় ছেলে ওমর ফারুকও সেলিমের সঙ্গে একই কারখানায় চাকরি করেন। নিয়ামুল পড়ছেন মাদরাসায়। আর সবার ছোট বুলবুলও (১২) একটি হাফেজিয়া মাদরাসায় পড়ছে। বাড়িভিটাসহ ৪ দোন (২৪ শতকে একদোন) জমির মালিক কৃষক কফিলের সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও সন্তানের ইচ্ছা পূরণে কখনো বাধা দেননি। বরং প্রতিবেশীরা যখন গাড়ি বানানোর প্রস্তুতি দেখে উপহাস করেছিলেন তখন উৎসাহ দিয়েছেন কফিল। সেই অনুপ্রেরণায় সেলিমও হার মানেননি নিজের ইচ্ছে পূরণে।

jagonews24

জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে সেলিম জাগো নিউজকে জানান, ছোটবেলা থেকেই তার গাড়ি বানানোর ইচ্ছে ছিল। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে আর পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি। পড়ালেখার পাঠ চুকে দিয়ে বাবাকে কৃষিকাজে সহায়তা করতে থাকেন। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে ২০০৭ সালের শুরুতে কিশোর বয়সেই পাড়ি জমান রাজধানীতে। নিজের স্মার্টফোন না থাকায় সহকর্মীদের কাছ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে অবসরে ইউটিউবে গাড়ি বানানোর ভিডিও দেখতেন। ইউটিউবে এ রকম একটি গাড়ির মডেল দেখে তিনিও গাড়ি বানানোর প্রস্তুতি শুরু করেন।

সেলিম জানান, তার উদ্ভাবিত চার চাকার ইলেকট্রিক গাড়িটি ১০০০ ওয়াটের হাইস্পিড মোটর ও ৬০ ভোল্টের ব্যাটারিতে চলবে। এখন একবার চার্জ দিলেই ১০০-১২০ কিলোমিটার পথ যাওয়া যাবে। চার্জার মেশিন দিয়ে ব্যাটারি ফুল চার্জ হতে সাড়ে আট ঘণ্টা সময় লাগে। তবে আগামীতে এই গাড়িটিতে নতুন ডায়নামা সংযোজন করা হবে। এতে গাড়ির চাকা যত ঘুরবে, ব্যাটারি ততই চার্জ হবে। তখন প্রতিদিন চার্জার মেশিনে ব্যাটারি চার্জ করার প্রয়োজন হবে না।

তিনি বলেন, ‘ছোটভাই নিয়ামুলকে সঙ্গে নিয়ে মোটর ওয়াইন্ডিং, ইলেকট্রিক ফিটিং, চেসিসসহ গাড়ির যাবতীয় সব কাজ বাড়িতে করেছি। ইলেকট্রিক কাজের বিষয়ে তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু সামুদা কেমিক্যাল কোম্পানির একজন ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে কার্বন ফাইবার বডি বানানো দেখে উদ্বুদ্ধ হই। আমার আগে থেকে ইচ্ছে ছিল নিজের বানানো গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর। তখন আমি নিজের জন্য গাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিই। প্রায় এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে গাড়িটির কাজ মোটামুটি শেষ করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় দেড়লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নতুন ব্যাটারি ও গাড়ির ছাদসহ আনুষাঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলে আরও ৫০ হাজার টাকা লাগবে। এবার ঈদের মধ্যে ছুটিতে গিয়ে বাকি কাজ শেষ করব।’

সেলিমের ছোটভাই নিয়ামুল ইসলাম বলেন, অনেকদিন ধরে একটা গাড়ি বানানোর স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন এখন পূরণ হয়েছে। এখনও সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে।

তিনি আরও বলেন, ‘গাড়ি তৈরির কাজের শুরুতে অনেক টাকা নষ্ট হয়েছে। প্রথমে ইঞ্জিন লাগানোর পরিকল্পনা ছিল। পরে ইঞ্জিন বাদ দিয়ে চার্জারব্যাটারি দিয়ে কাজ শুরু করা হয়। কখনো গাড়ির চাকা, মোটর, চেসিস নিয়ে এসে একটু একটু করে কাজ করেছি। এখন মোটামুটি গাড়িটা চালানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে। এখন দুই সিটের বেশি করা হয়নি। ভবিষ্যতে চাইলে এরকম গাড়ি চার সিটেরও করা যাবে।’

jagonews24

সেলিমের বাবা কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলেরা যখন গাড়ি বানানোর কাজ শুরু করে তখন আমি তাদের উৎসাহ দিয়েছি। আমার তো টাকা পয়সা নেই। ছেলেরা যা রোজগার করে তার মধ্য থেকে একটু একটু করে গাড়িতে ব্যয় করেছে। বড়ছেলে (সেলিম) ছুটিতে এসে ছোটছেলে (নিয়ামুল) মিলে কাজ করত। এখন খুব ভালো লাগছে। সবাই বাড়িতে এসে গাড়িটা দেখে যাচ্ছে। আমি তো গাড়ি চালাতে পারি না। ছেলেরা আমাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে একটু গ্রামে ঘুরেছে। এটাই আমার মনের শান্তি।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য (মেম্বার) আফরোজা বেগম বলেন, ‘সেলিমের তৈরি ব্যাটারিচালিত গাড়িতে উঠেছিলাম। এই গাড়ি তেমন কোনো দূষণ ঘটায় না। এটা পরিবেশবান্ধব। মোটরযান শিল্পের বিকাশে এ ধরনের উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়া উচিত। একই সঙ্গে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এরকম অনেক গাড়ি তৈরি করা সম্ভব হবে।’

সদ্যপুস্করিণী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহেল রানা বলেন, ‘সেলিমের পরিবার আর্থিকভাবে ততটা স্বাবলম্বী না। সে ঢাকায় একটি কোম্পানিতে কাজ করে। মাঝেমধ্যে ছুটিতে বাড়ি এসে গাড়ি বানানোর কাজ করত। কিছুদিন আগে সে গাড়ি নিয়ে পরিষদে এসেছিল। আমি তার এ কাজে মুগ্ধ হয়েছি। সে আমাদের গর্ব।’

রংপুর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাছিমা জামান ববি বলেন, গাড়িটি রাস্তায় নামানো হলে তা যেন নিরাপদ, স্বস্তি ও দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শ দরকার। আমার বিশ্বাস সেলিমের উদ্ভাবন বৃথা যাবে না।

জিতু কবীর/এসআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]