শিলপাটা ধার করা আতোয়ার চান না তার সন্তানরা এ কাজ করুক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:৪১ এএম, ১৮ এপ্রিল ২০২১

 

তিন পুরুষ ধরে শিলপাটা ধার করে আসছেন আতোয়ার (৪৪)। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বাবা মো. আব্দুল গফুরের সঙ্গে তিনিও করতেন শিলপাটা ধারের কাজ। বাবার সাথে নওগাঁর হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে এ কাজ করতেন তিনি। কাঁচাটাকা হাতে পাওয়ায় পূর্বপুরুষের এই পেশাকেই আপন করে নেন তিনিও।

নওগাঁর নজিপুর বাজারেই আতোয়ারের বাড়ি। দুই সন্তানের বাবা তিনি। ৩ বছরের মেয়ে আশা ও ২৭ দিনের এক ছেলে আলো ছড়াচ্ছে আতোয়ারের ঘরে। এখনও ছেলের নামকরণ হয়নি। তবে ৮ দিনের কঠোর লকডাউন ছুটলে বাড়িতে গিয়ে রাখবেন তার রাজপুত্রের নাম।

আতোয়ার জানায়, বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তান থাকেন নওগাঁর নজিপুরে। নওগাঁয় তেমন কাজ নেই, তাই তাদের ছেড়ে এসেছেন রাজশাহীতে। ৪-৫ দিন পর পরই একদিনের জন্য যান নওগাঁয়।

একটি ছোট্ট হাতুড়ি, দুটি ছেনি, আর একটি হ্যান্ডমাইকই সম্বল আতোয়ারের। হ্যান্ডমাইকে রেকর্ডিং সিস্টেম থাকাই মুখ দিয়ে বলতে হয় না কথা। তবে চার্জ চলে গেলে কিংবা পরিচিত কিছু বাসায় পোঁছালে মাইকে নিজেই আওয়াজ দেন শিলপাটা ধারের জন্য।

ধানশীষ, কুলাঝাঁপি, মাছ কাটাই, শাপলা ফুল, নৌকা কাটাইয়ের মতন বিভিন্ন ধরনের কারুকার্যের রূপ দেন পাটার ওপর। শুধু শিলপাটাই নয়, হাঁসুয়া, বটি, ছুরি, কাঁচিও ধার করান তিনি।

প্রতিদিন পায়ে হেঁটে শহরের অলিগলিতে ঘুরে দিনে রোজগার হয় ৪০০-৫০০ টাকা। সেই টাকা থেকে নিজে তিনবেলা খাওয়া ও থাকার ভাড়া দিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে তা জমান পরিবারের জন্য। সকাল হলেই আবার বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে।

রাজশাহীর শিরোইল বাস্তুহারা এলাকায় ৪ রুমের ভাড়া বাসায় মোট ৩০ জনের মতন থাকেন। তাদের সবাই শিলপাটা ধার করানোর কাজ করেন। দিনপ্রতি থাকার জন্য ২৫ টাকা করে ভাড়া গুনতে হয় তাদের।

আতোয়ার জানান, প্রথম লকডাউনের কথা শুনে অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। দ্বিতীয় কঠোর লকডাউনের ঘোষণা শোনার পর শহর ছাড়েন আরও ১০-১২ জন। তিনিসহ এখন ১০ জনের মতন আছেন রাজশাহীতে। লকডাউন ছাড়লে কিংবা বাস চলাচল শুরু হলে তিনিও ফিরবেন বাসায়।

তবে আতোয়ারের সাধ ছিল ঈদের আগে বেশি সময় কাজ করে বাড়তি কামাই করবেন। তা দিয়েই বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানদের জন্য ঈদের বাজার করে ফিরবেন নিজ গৃহে।

কিন্তু ‘লকডাউন’ ও ‘কঠোর লকডাউন’র কারণে বড্ড বিপাকে পড়েছেন আতোয়ার। লকডাউনে বাপ-দাদার পেশায় পড়েছে ভাটা। বাড়তি কাজ করে আয়তো দূরের কথা, বাড়ি থেকে বের হতেও পারছেন না পুলিশের ভয়ে।

‘কঠোর লকডাউন’র প্রথম দিন ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের টহল দেখে ভয়ে বের হতে পারেননি বাড়ি থেকে। কিন্তু পকেটে টাকা না থাকায় দ্বিতীয় দিন আর থাকতে পারেননি বাসায়। হাতুড়ি ও ছেনি রাখার ছোট ব্যাগ ও হান্ডমাইক নিয়ে বেরিয়েছেন জীবন সংগ্রামে। অলিগলিতে ঘুরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কামাই করতে পেরেছেন ২৬০ টাকা। এই সামান্য ইনকামেও বেজাই খুশি আতোয়ার।

তিন যুগ ধরে শিলপাটা ধার করা জীবন সংগ্রামী আতোয়ার বলেন, আমি যেমন পথে-পথে, বাড়ি-বাড়ি ঘুরে আমার জীবনটা ক্ষয় করছি। তাদের জীবন যেন এভাবে ক্ষয় না হয়। তাই যত কষ্টই হোক, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করব। লেখাপড়া শিখে তারা যেন অন্তত ডালভাত উপার্জন করতে সক্ষম হয়, এটাই আমার স্বপ্ন।

ফয়সাল আহমেদ/এফএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]