ভোগান্তি নিয়েই ঢাকামুখী হচ্ছেন রাজশাহীর গার্মেন্টসকর্মীরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০২:১৪ এএম, ০১ আগস্ট ২০২১

দেশব্যাপী চলছে কঠোর বিধিনিষেধ। এর মধ্যে হুট করেই শনিবার (৩১ জুলাই) বিকেলের দিকে কয়েক ঘণ্টার জন্য স্বল্প পরিসরে বাস-লঞ্চ চালুর সরকারি সিদ্ধান্তের খবর আসে। তবে বন্ধ রয়েছে রেল সেবা। বাস চালুর এই খবর পেয়েই কর্মের তাগিদে নানা ভোগান্তি নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকামুখী হচ্ছেন মানুষ। আসছেন রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনালে। তাদের সবাই পরিচয় দিয়েছেন গার্মেন্টসকর্মী হিসেবে।

শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, কর্মের তাগিদে রাজশাহীর বাস টার্মিনালে ঢাকামুখী অনেক যাত্রীই এসেছেন। শিল্পকারখানা খোলার কথা শুনে অনেকেই আগের দিন মাইক্রোবাস কিংবা রিজার্ভ প্রাইভেটকারে করে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরেছেন। তবে হঠাৎ করে কিছু সময়ের জন্য সরকার পরিবহন চালুর সিদ্ধান্ত দেয়ায় বাস টার্মিনালে লোক সমাগম কিছুটা কম ছিল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট থানার বাসিন্দা মো. ওয়াহেদ আলী (৩৩)। কাজ করেন ঢাকার সাভারের একটি গার্মেন্টস কারখানায়। আজ দুপুরেই ১২ জন ঢাকাগামী যাত্রী মিলে ঠিক করেছিলেন একটি মাইক্রোবাস। ভাড়া মিটে ছিল ২৫ হাজার টাকায়, কিন্তু পথিমধ্যেই ঘটে দুর্ঘটনা। রাজশাহীর উপকণ্ঠ কাশিয়াডাঙ্গা থানা এলাকায় এসে গাড়ির ব্রেক ফেল হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন যাত্রীরা। এতে কেউ গুরুতর আহত না হলেও গাড়িসহ চালককে আটকে দেন কাশিয়াডাঙ্গা থানা পুলিশ। আর তাই ওয়াহেদ আলীসহ বাকি যাত্রীদের অটোরিকশায় কোনো রকমে পৌঁছান রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে।

jagonews24

ওয়াহেদ আলী বলেন, ‘দুর্ঘটনার সামান্য আঘাত পেয়েছি। তারপর অনেক কষ্টে রাজশাহীতে পৌঁছেছি। এখানে দুই সিটের ভাড়া ১ হাজার ৮০০ টাকা করে নিচ্ছে কিন্তু পাশাপাশি সিটটি ফাঁকা রাখছে না। তারপরও যেতে পারছি এতেই আলহামদুলিল্লাহ।’

ওই একই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলেন ডলি বেগম। ১২ বছরের ছোট ছেলে ও ভাগ্নিসহ যাচ্ছিলেন ঢাকার সাভারে। সেখানকার গার্মেন্টসে কাজ করেন তিনি। ডলি বলেন, ‘বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রওয়ানা দিয়েছি। আবার রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট। হঠাৎ ফ্যাক্টরি খোলায় ঢাকায় যেতে হচ্ছে। তবে সরকার যদি দু-একদিন আগেভাবে জানাতো, তাহলে খুব ভালো হতো। যাত্রাপথে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না।’

তানোর এলাকার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন। তিনিও অন্যদের মতো পোশাক শিল্প-কারখানায় কাজ করেন। তার সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন সহকর্মী। তিনি জানালেন, বেশ কষ্টেই এসেছেন রাজশাহী বাস টার্মিনালে।

তার ভাষ্য, ‘সরকারের এমন হুট করেই সিদ্ধান্ত দেয়াটা সঠিক হয়নি। হুট করে এমন সিদ্ধান্ত দেয়ায় অনেক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়েছে। সিদ্ধান্ত যদি দু-একদিন আগে দিতো তবে বেশ ভালো হতো।’

তানোরের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন। অ্যাসিসটেন্ট অপারেটর হিসেবে কাজ করেন আশুলিয়ার মিউচুয়াল গার্মেন্টস কারখানায়। তার সঙ্গে আছেন মো. হোসেন আলী, তিনি কাজ করেন ন্যাচারাল গ্রুপের গার্মেন্টস কারখানায়। দুজনেই ফিরছেন ঢাকায়। বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ঈদের বেশ কয়েকদিন যাবত ঢাকা ফেরার চেষ্টায় ছিলাম। তবে বাস চলাচল বন্ধ ও মাইক্রো ভাড়া অনেক বেশি হওয়ায় যেতে পারছিলাম না। তবে সরকারের হুট করেই গাড়ি চলার সিদ্ধান্ত দেয়ায় আজ ঢাকার উদ্দেশে বের হয়েছি।’

jagonews24

এদিকে হুট করেই একদিন বাস চলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নাখোশ অধিকাংশ বাস মালিক ও শ্রমিকেরা। শিরোইল বাস টার্মিনালের হানিফ, দেশ, ন্যাশনাল ট্রাভেলসসহ দূরপাল্লার অনেক বড় বড় বাসগুলোই ছিল বন্ধ। কিছুক্ষণের জন্য একতা ট্রাভেলস কাউন্টার খুললেও তারা পর্যাপ্ত যাত্রী না হওয়ায় বন্ধ করে দেন। ফলে দূরপাল্লার লোকাল বাসগুলো যাত্রী নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা দেয়।

কথা হয় বাস টার্মিনালে গাড়ির মধ্যে থাকা বাসচালক খলিলের সঙ্গে। হঠাৎ করে বাস চালুর বিষয়ে তার মন্তব্য চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্তব্য আর কী, হুট করে সিদ্ধান্ত দিল। গাড়ি নিয়ে যাব আবার ঘুরে আসব, এটাই সিদ্ধান্ত। তাও আবার সাড়ে ৮টার পরে খবর পেলাম।’

আগেই সিদ্ধান্ত জানালে ভালো হতো কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে দিলে তো ভালোই হতো। আগে সিদ্ধান্ত দিলে গাড়িতে যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতো না। আরামে বসে যেতে পারত। আবার আমরাও অনেক যাত্রী পেতাম। কোনো সমস্যা হতো না। হুট করে দিয়েই তো সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে চাওয়া হয় কাউন্টারে বসে থাকা কয়েকজন টিকিট মাস্টারের সঙ্গে। তবে তারা এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে আপত্তি জানান। একজন বললেন, ‘আমাদের শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে মিডিয়াতে কথা বলা নিষেধ আছে। কথা বলতে পারব না, প্লিজ আপনি যাত্রীদের সাথে কথা বলেন।’

এদিকে রাস্তায় আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও যান চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে কথা হয় রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) নগর মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যানবাহন চলাচলের সিদ্ধান্তটি আমার জানা ছিল না। খবরটি সন্ধ্যার দিকে আমরা পেয়েছি। খবরটি পাওয়ার পরপরই ট্রাফিক বিভাগ ও আমাদের আরএমপির কমিশনার মহোদয় আরএমপির সকলকে জানিয়ে দেন- যানবাহন যেন নির্বিঘ্নে চলতে পারে।’

তিনি যোগ করেন, ‘এটি মূলত সরকারি একটি সিদ্ধান্ত। আমরা শুধু রাস্তায় যান চলাচল যেন ঠিক থাকে সেই বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে সবাইকে সজাগ থাকতে বলেছি। আগামীকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তটি বহাল থাকবে। তবে পরবর্তীতে তা বৃদ্ধি করা হলে সেটিও জানিয়ে দেয়া হবে।’

ফয়সাল আহমেদ/এমআরআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]