সমন্বয়হীনতা-অসচেতনতায় মহাসড়কে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি সাভার
প্রকাশিত: ০২:৫০ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০২১

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সংস্কার ও নানা উদ্যোগ নিলেও ঠেকানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। সড়কে প্রতি বছরই বেড়েই চলছে মৃত্যুর সংখ্যা। চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর পথচারীদের অসাবধানতায়ই ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। এছাড়া তিন চাকার ধীরগতির নিষিদ্ধ যানবাহন সড়কে উঠে পড়ায় প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ।

সড়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, পথচারীদের সচেতনতা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারলে মৃত্যুর মিছিল কখনোই কমানো যাবে না।

jagonews24

ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে পুরোদমে। কিন্তু প্রতিটি স্ট্যান্ডে পথচারী পারাপারে নেই সুব্যবস্থা। ফলে ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হচ্ছে পথচারীরা। আবার অনেককেই কানে হেডফোন অথবা মোবাইলে কথা বলতে বলতে সড়ক পার হতেও দেখা যায়। ফলে প্রতিনিয়তই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। শুধু তাই নয়, সড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাটবাজার আর বিভিন্ন মালামাল ফেলে রাখায় সরু হয়ে গেছে সড়ক। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে চলাচল।

অন্যদিকে সড়কে চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে ঘটছে সংঘর্ষ আর চাপা দেয়ার ঘটনা। ঢাকা-আরিচা সড়কের আমিনবাজার, গেন্ডা, ব্যাংক কলোনি, নবীনগর, বিশমাইল, নয়ারহাট, ধামরাইয়ের ইসলামপুর, ঢুলিভিটা, জয়পুরা, কালামপুর, সুতিপাড়া, শ্রীরামপুর, বাথুলি ও বারবারিয়া পয়েন্টে প্রায় একই চিত্র।

jagonews24

ফলে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও সামাজিক সংগঠনগুলো চালক-পথচারীদের সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নিলেও ফল মিলছে না।

নিরাপদ সড়ক চাই ধামরাই শাখার এক হিসাব বলছে, গত বছরের চেয়ে এবার মৃত্যু হার বেড়েছে। ২০২০ সালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শুধু ধামরাই অংশে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮০টি। এতে ৩৯ জন নিহত ও অন্তত ১৫৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি মার্চে। সে মাসে আটটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। আগস্টে চারটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় আটজন। সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে নভেম্বরে ৪৩ জন ও ফ্রেব্রুয়ারিতে ৩১ জন।

jagonews24

চলতি বছরের গত আট মাসেই ঝরেছে ৩০ তাজা প্রাণ। আহত হয়েছেন ১৭৮ জন। জানুয়ারি থেকে আগস্ট- আট মাসে দুর্ঘটনা ঘটছে ১১৩টি। যদিও মে ও জুলাই ছিল লকডাউন। তবুও এ দুই মাসেই মারা গেছেন ছয়জন। চলতি বছর সবচেয়ে বেশ মৃত্যু হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। ১৪ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সাতজন ও আহত হয়েছেন ২৭ জন। এর আগের মাস জানুয়ারিতে মারা যায় ছয়জন। এমন পরিসংখ্যান শুধু ধামরাইয়ে হলেও সাভার অংশে ঘটেছে আরও বেশি।

দুর্ঘটনা নিয়ে কথা হয় ট্রাকচালক সিরাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, সব ঘটনার জন্য চালক দায়ি থাকে না, পথচারীরও থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুই গাড়ির প্রতিযোগিতায় বড় দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় দেখা যায় হঠাৎ করে গাড়িতে ত্রুটি দেখা দেয় তখন চালকের কিছু করার থাকে না। কিছু কিছু ছোট ত্রুটি মালিককে সারাতে বললেও অনেক সময় তা ঠিক করে দেন না। সেই ছোট ত্রুটি থেকেও বড় ঘটনা ঘটে।

jagonews24

চালক আকবর বলেন, মালিকদের দ্রুত টাকা কামানোর মানসিকতার কারণেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। চালককে কোনো বিশ্রাম না দিয়েই একের পর এক ট্রিপে পাঠিয়ে দেন। না গেলে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। পেটের টানে ঝুঁকি নিয়ে চালকরা বাধ্য হন গাড়ি চালাতে।

ভিন্ন মত পোষণ করে সাধারণ মানুষ। পোশাক শ্রমিক আরিফুল জানান, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান চালকরা। লক্কর-ঝক্কর গাড়িতে রং দিয়ে সড়কে নামান। গাড়ি মেরামতে টাকা ও সময় লাগবে বলেই তারা জোড়াতালি দিয়ে কাজে নেমে পড়েন। এরপরই দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করে।

ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ধামরাইয়ের ঢুলিভিটা ডাউটিয়া, বাথুলি, ইসলামপুর, সাভারের নবীনগর, নয়ারহাট এলাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব স্থানকে অনেকে ব্লাক স্পট হিসেবেও দেখছেন।

jagonews24

নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনের ধামরাই শাখার সভাপতি মোহাম্মদ নাহিদ মিয়া বলেন, প্রতিনিয়ত মানুষকে সচেতন করতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কখনো মাঠে কখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তবুও চালক ও পথচারীদের সচেতন করা যাচ্ছে না। আইনের কঠোরতা প্রয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমতো বলে মনে করেন তিনি।

হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক আতিকুর রহমানও দাবি করেন, কখনো চালক কখনো পথচারীদের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটছে। পরিবহনের ফিটনেসের কারণেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। বেপরোয়া গতি আর ফিটনেসবিহীন পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে।

পরিবহন বিশ্লেষক আমজাদ হোসেনের মতে, পরিবহন সেক্টরে এখনো ফেরেনি শৃঙ্খলা। সমন্বয়ও নেই এক সংস্থার সঙ্গে আরেকটির। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিআরটিএ আনফিট গাড়ি ফিট দেখিয়ে সনদ দিচ্ছে। পুলিশ আনফিট দেখেও সনদ থাকায় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আবার সড়ক ও জনপথের জমি দখল করে সড়কের পাশেই গড়ে উঠছে হাট-বাজার। এতে সেল্টার দিচ্ছেন রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। যতদিন না উদাসিনতা না কাটছে ততদিন দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব হবে না।

এএইচ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]