‘সমাপ্তি’র ভাগ্যে কী?

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৬:৩৩ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০২১

কুমারী সমাপ্তি দাসের বয়স ৯ বছর। আর দশটা শিশুর মতো সুস্থ-স্বাভাবিক জন্ম হয়নি তার। হরমোনজনিত সমস্যাসহ নানা জটিল রোগ বাসা বেঁধেছে তার ছোট্ট শরীরে। সব ধরনের অনুভূতির স্বাভাবিক প্রকাশও করতে পারে না সে। তবে পরিবারের সবাইকে চেনে। শুধু নাম ধরে ডাকতে পারে। অন্যান্য শিশুদের খেলা দেখে খেলতে চায়। কিন্তু দৌড়-ঝাঁপ দিয়ে খেলা করতে ব্যর্থ সে।

সমাপ্তির বাবা বিজয় চন্দ্র দাস কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা এলাকার বাসিন্দা। ২০০৯ সালের দিকে মুন্নি রানী দাসকে বিয়ে করেন তিনি। দেড় বছর সংসারের পর জন্ম হয় সমাপ্তির।

মুন্নি রানীর অভিযোগ, অসুস্থ হয়ে জন্ম নেওয়ায় মেয়েকে সাড়ে ছয় মাসের মাথায় শ্বশুর মঙ্গল চন্দ্র দাসের বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঝলমলিয়া গ্রামের ঋষিপাড়ায় রেখে যান বিজয় চন্দ্র। এরপর থেকে সমাপ্তি ও তার মা আছেন সেই বাড়িতে। নানা-নানিই যেন সমাপ্তি ও তার মায়ের শেষ ভরসা।

যদিও বিজয় চন্দ্র দাসের দাবি, মুন্নি রানী স্বেচ্ছায় সংসার ছেড়েছেন। তাছাড়া তিনি নিজের মেয়েকে নিতে চাইলেও মুন্নি রানী দেননি।

মেয়েকে সুস্থ করে তোলার জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে মুন্নি রানী বলছেন, তিনি মেয়েকে সর্বশেষ দেখিয়েছেন রাজশাহীর বেসরকারি ল্যাবএইড হাসপাতালে। মেয়ের সুস্থতাই একমাত্র চাওয়া তার।

মুন্নি রানী দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘মেয়ে অসুস্থ হয়ে জন্মেছে। তাই স্বামী সন্তানসহ আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। দীর্ঘ ৯ বছর থেকে এ অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে একা লড়ে যাচ্ছি। অর্থ সংকটের কারণে তার সঠিক চিকিৎসাও করাতে পারছি না।’

‘ডাক্তার জানিয়েছন, সঠিক নিয়মে চিকিৎসা করাতে পারলে সমাপ্তি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। এদিকে মা-বাবার অভাবের সংসারে পড়ে আছি। তাদের পক্ষে আমার মেয়ের চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। কেউ আমাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলে আমার মেয়েটা সমাজের আর দশটা বাচ্চার মতো স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারবে’—বলেন মুন্নি রানী।

সমাপ্তির নানি ভারতী রানী দাস বলেন, ‘প্রায় একযুগ আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় সমাপ্তি জন্মগ্রহণ করে। ডাক্তার বলেছে সমাপ্তির হার্টের সমস্যা ও নিউমোনিয়া নিয়ে সে জন্মেছে। সমাপ্তির এ অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা দেখে তার বাবা চরম নাখোশ হয়। ছয় মাস যেতে না যেতেই সমাপ্তি ও তার মাকে (আমার মেয়ে) আমাদের বাড়িতে ফেলে রেখে চলে যায়। এরপর আর তাদের খোঁজ নেয়নি। লোকমুখে শুনেছি আমার মেয়েকে ছেড়ে দিয়েছে। জামাই কয়েক বছর আগে আরেকটি বিয়ে করে সংসার করছে।’

‘সমাপ্তি’র ভাগ্যে কী?

ভারতী রানী আরও বলেন, ‘আগে বাড়িওয়ালা (তার স্বামী) বাসচালক ছিলেন। তখন আয়-উপার্জন ভালো ছিল। একটি দুর্ঘটনার পর থেকে আর কাজ করতে পারেন না। এখন মেয়ে ও অসুস্থ নাতনিকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন যাচ্ছে তাদের। মাঝে মধ্যে সমাপ্তির ওষুধপত্র কিনতে মানুষের দুয়ারে হাত পাততে হয়।’

যোগাযোগ করলে বিজয় চন্দ্র দাস স্ত্রী-কন্যাকে ছেড়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি তাকে (স্ত্রী) ডিভোর্স দেইনি। সে স্বেচ্ছায় সংসার করেনি। আমি তাকে বারবার সংসারের জন্য ডেকেছিলাম, কিন্তু সে আসেনি। তার জন্য আমি আড়াই বছর পর আবার বিয়ে করি। এতে আমার কোনো দোষ নেই।’

বিজয় আরও বলেন, ‘আমি এখনো আমার মেয়েকে নিতে চাই। কিন্তু সে তাকে দিতে চায় না। উল্টো শুনছি মেয়ের অসুখের বিষয়টি নিয়ে সাহায্য চাইছে। সে যদি আজ আমার মেয়েকে দিতে চায়, আমি আজই তাকে নিয়ে আসবো।’

সমাপ্তির চিকিৎসার বিষয়ে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের শিশু ইন্টারডেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার নুরনাহার ফাতেমা বলেন, ‘সমাপ্তির বয়স ৯ বছর। তার শারীরিক অবস্থা সুস্থ বাচ্চাদের মতো নয়। আমরা শিশুটিকে প্রাথমিকভাবে দেখেছি। তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বলা হয়েছে। তার পরীক্ষার ওই প্রতিবেদন এলে বলা যাবে সে ঠিক কী রোগে আক্রান্ত। সে মোতাবেক তার চিকিৎসা করা প্রয়োজন হবে।’

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল জলিল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময় গরিব ও অসহায়দের নিয়ে ভাবেন। তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থার নির্দেশনা দিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অসহায় ও গরিব মানুষের চিকিৎসা অনুদান স্বরূপ সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিশু সমাপ্তির পরিবার যদি জেলা প্রশাসনের কাছে একটি দরখাস্ত করে এবং তার চিকিৎসার কাগজপত্র জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দেয়, সেক্ষেত্রে আমার পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো সম্ভব হবে। তার কী সমস্যা বা প্রয়োজন তা পর্যালোচনা করে তাকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।’

ফয়সাল আহমেদ/এসজে/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]