সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ: চমেকজুড়ে ইউটিউবারদের দৌরাত্ম্য

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর চমেক থেকে
প্রকাশিত: ১২:১১ পিএম, ০৬ জুন ২০২২
চমেকের ইমার্জেন্সি গেটে ইউটিউবারদের ভিড়ে জটলা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়

‘এখন ডিজিটাল যুগ। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যেকোনো তথ্যের জন্য অনলাইনে চোখ রাখেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেড়েছে ব্যক্তিগত চ্যানেল ও অনলাইন একাউন্ট। ইউটিউবসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়ানো হচ্ছে ভিউয়ার। ভিউ বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে অনলাইনে আয়। এটি দেখে এসব অনলাইন একাউন্ট হোল্ডারদের মাঝে শুরু হয় ‘ভিউয়ার বাড়ানোর’ অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তাই যেকোনো দুর্যোগের অসত্য তথ্যও প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ান। সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিতেও একইরকম কাণ্ড ঘটেছে।

সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তিদের রক্ত দিতে আসা একাধিক মানুষ এমনটাই অভিযোগ করেছেন।

নিজেদের নাম ও ভিডিও প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখি দ্বগ্ধ ও আহতদের চিকিৎসায় রক্তের জন্য চমেকে হাহাকার চলছে। স্ট্যাটাস ছাড়াও যার ভিডিও বার্তাও প্রচার হচ্ছিল ইউটিউব চ্যানেল এবং ফেসবুক পেজে। এমনভাবে প্রচার হচ্ছিল যে, পাষাণ হৃদয়ের মানুষটিও হাসপাতালে ছুটে এসেছে। কিন্তু এসে জানা গেলো পোড়া রোগীর চিকিৎসায় তেমন রক্তের দরকার পড়ে না। ফলে রক্তের জন্য হাহাকার পড়েনি। কিন্তু এখানে বিষয়টি এমনভাবে প্রচার হচ্ছিল, যে কেউ দেখেই আহতদের প্রাণ রক্ষায় ছুটে এসেছেন চমেকে। এভাবে লোকের জটলা বেড়েছে।

jagonews24

এসব অসত্য তথ্য প্রচার নিয়ে উদ্বেগ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন স্বয়ং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমানও। প্রেস ব্রিফিংকালে ডিসি মমিন বলেন, ‘অননুমোদিত অনলাইন চ্যানেল ও সামাজিক পেজে সীতাকুণ্ডের অগ্নি দুর্ঘটনায় হতাহতসহ নানা বিষয় নিয়ে অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এটি মোটেও শুভ নয়। ডিজিটালাইজেশনে অনলাইনে আয়ের পথ থাকায় এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েও মনগড়া কথা প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। এটি মোটেও কাম্য নয়।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডে অগ্নি দুর্ঘটনায় সৃষ্ট মানবিক সংকটে সব পেশার লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তা দিচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস, সেনা, আনসারসহ সরকারি সকল বিভাগের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবী নানা সংগঠন। এসেছেন শিক্ষার্থী, যুবকসহ নানা পেশার মানবিক মানুষগুলো।

আহতদের উদ্ধার, হাসপাতালে আনাসহ সকল কাজে স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনকে সহযোগিতা দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী টিম। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটসহ সব সেবাস্থলে প্রয়োজনের অধিক স্বেচ্ছাসেবীর উপস্থিতি জটলা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। স্বেচ্ছাসেবীর পোশাকে দাঁড়ানো অনেক উৎসুক তরুণ দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে লাইভ প্রচার করছিলেন। ভিডিও ধারণ করে প্রচার করছিলেন নিজস্ব বা দলগত ইউটিউব চ্যানেল বা টাকার বিনিময়ে অন্যের চ্যানেলে।

আহত রোগী নিয়ে কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিংবা সিএনজি অটোরিকশা এলেই মোবাইল ফোন ধরা অসংখ্য হাত সেই গাড়িকে ঘিরে ধরছে। এদের কারণে স্বেচ্ছাসেবী কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী কেউ যথাযথ দায়িত্বপালন করতে পারছিলেন না। কোনো ভিডিও কিংবা ছবি নিতেও পারছিলেন না মূলধারার গণমাধ্যম কর্মীরা।

jagonews24

জেলা প্রশাসন কিংবা অন্য সরকারি সংস্থার ব্রিফিংয়েও গণমাধ্যমের ক্যামেরার আগে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক অনলাইন চ্যানেলগুলোর মোবাইল ক্যামেরা ভিড় জমিয়ে জটলা করেছে। এতে বাড়িয়েছে বিড়ম্বনা।

পতেঙ্গা থেকে রোগী নিয়ে আসা এনজিওকর্মী এরশাদুজ্জামান বলেন, সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি চরম হৃদয় বিদারক। এমন সংকটে সেবায় এগিয়ে আসা বড় মানবিকতা। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ বলা চলে। অনেক তথ্য প্রচার মাধ্যমের আগে লোকজন এখান থেকে জানতে পারছেন। আমরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীতাকুণ্ডের বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু অনেকে কাল্পনিক তথ্য প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। প্রশাসনিক কোনো অথরিটির বক্তব্য না নিয়ে নিজেদের মতো করে হতাহতসহ রাসায়নিক বিষক্রিয়ার তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এতে ছড়িয়েছে আতংক। নিজের চ্যানেলের কাটতি বাড়িয়ে, কিছু আর্থিক লাভের আশায় এমন হটকারি প্রচারণা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য চরম ক্ষতিকর।

jagonews24

এদিকে নিজেদের চ্যানেলের ভিউয়ারদের সর্বশেষ আপডেট জানাতে চট্টগ্রাম শহর ও আনাচে-কানাচের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টসহ ঢাকা এবং অন্য জেলা শহরের পরিচিত ইউটিউবাররাও হাসপাতাল এলাকায় এসে রোববার মধ্যরাত পর্যন্ত লাইভ দিয়ে নিজেকে জাহির করেছেন। অনেকে নিয়ে এসেছেন বন্ধু ও সমর্থকদের বিশাল বহর। এরা আবার নিরাপত্তাকর্মীদের ঠেলে ইমার্জেন্সি কক্ষে প্রবেশ করেও লাইভ করেছেন।

এসব দেখে সেনাবাহিনী ও র্যাব জরুরি বিভাগের সামনে ও আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক এবং এসব ইউটিভারদের সরিয়ে দিলে ভোগান্তি কমে।

এদিকে ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনে রোববার রাত ১২টা পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪৯ জন বলে জানিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ হোসেন চৌধুরী।

তবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান ব্রিফিংয়ে জানান, এ সময় পর্যন্ত নিহত ৪৬ জনের তথ্য এসেছে তাদের কাছে। আর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরো ১৬৩ জন।

jagonews24

শনিবার (৪ জুন) রাত ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় রাসায়নিক থাকা একটি কনটেইনারে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এটার পর আরো একাধিক কন্টেনার বিস্ফোরণ হয় বলে জানান আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা প্রশাসনের টিম। এতে কয়েকশ মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে ডিপোর শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও রয়েছেন।

ঘটনার পরপরই আহতদের অধিকাংশকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া অনেককে ভর্তি করা হয়েছে নগরীর অন্যান্য হাসপাতালেও। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ৯ কর্মীও রয়েছেন।

এফএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।