ফিশারির বাঁধে পানির নিচে ৩২ হেক্টর আবাদি জমি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ০১:৩৩ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২২

দেখলে মনে হবে যেন বিশাল বড় এক বিল, পুরোটা জুড়েই কচুরিপানা দিয়ে ছেয়ে আছে। তবে এটা বিল নয়, প্রায় ৩২ হেক্টরের ফসলি জমি। প্রতি বছর এখানে চাষ করা হয় বোরো ও আমন ধান, পেঁয়াজ, রসুন এবং মরিচ, আলু, শসা, করলা, লাউ কুমড়াসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি। কিন্তু এবার আমনের মৌসুমে অপরিকল্পিত ফিশারি ও পুকুর তৈরি করায় ওই জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সময় চলে গেলেও আমন চাষ করতে পারছেন না কৃষকরা। পাশাপাশি পচে গেছে সবজির ক্ষেতও।

এমন চিত্রই দেখা গেছে ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের নন্দিগ্রামে। এ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে ৪৯ জন কৃষক ৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারে কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও সমাধান পাননি। এদিকে আমন চাষের সময় শেষ হয়ে আসায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে অচিরেই এ সমস্যার সমাধান করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্বাহরী ফসলের মাঠে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে পাশের দোয়েল বিল দিয়ে পানি নেমে যেত। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ফিশারি ও পুকুরের কারণে গত বছরও জলাবদ্ধতা তৈরি হলে আমন ও বোরো চাষ আটকে যায়। স্থানীয়রা বসে ফিশারির পাড় কাটার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েকটি ফিশারির পাড় কেটে দিলে পানি নেমে যায়। পরে ওই জমিতে আমন, বোরো ধান ও সবজি চাষ করেন কৃষকরা।

এ বছর স্থানীয় আবুল হাসেম, দস্তর আলী, জনাব আলী, আব্দুল খালেক, ভুট্টো মিয়াসহ আরও বেশ কয়েক জন ফসলের মাঠ থেকে বিলে পানি নামার জায়গায় খননযন্ত্র দিয়ে ফিশারি ও পুকুরের বাঁধ তৈরি করেন। যে কারণে আব্বাহরী ফসলের মাঠের পানি নামছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন কয়েক শতাধিক কৃষক।

jagonews24

কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আব্বাহরীতে আমার তিন একর জমি আছে। ওই জমির ধানেই আমার সংসার চলে। গতবারও বোরো ও আমনসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছি। বাঁধের কারণে যে পানি জমেছে তাতে মনে হয় এবার ধান লাগাতে পারবো না। তবে ধান লাগাতে না পারলে বউ বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’

কৃষক আরিফ সরকার বলেন, ‘পানির কারণে প্রায় ৮০০ কাঠা জমি পানিতে তলিয়ে আছে। ৩০০ কাঠা জমির সবজি পানির কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। যদি পানি নামার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে আবার আবাদ করতে পারবো। পানি দ্রুত অপসারণের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’

কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন, ‘দোয়েল বিলে অপরিকল্পিত পুকুরের কারণে আমিসহ প্রায় ১০ থেকে ১৫ পরিবার পানি বন্দি হয়েছি। ঘরে, উঠানে, রান্নাঘরে টয়লেটেসহ সব জায়গাতেই পানি। টয়লেটের প্রয়োজনে যেতে হয় অন্যের বাড়িতে। খাওয়া দাওয়া রান্নাবান্না একই অবস্থা। এছাড়া গরু, ছাগল, হাস মুরগি নিয়েও বিপদে আছি। আমরা এখন নিজ বাড়িতেই পরবাসী। এখানে ছোট একটি খাল তৈরি করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে।’

কৃষক মোহাম্মদ উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে ফিশারি ও পুকুর তৈরির কারণে ৩২ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ওইখানে অনেক পুকুর ছিল, তাও তলিয়ে গেছে। এছাড়া প্রায় ১০০ কাঠা সবজি চাষ করা হয়েছিল। পানি উঠে সব সবজি পচে গেছে।’

jagonews24

তিনি আরও বলেন, ‘এ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে আমরা ৪৯ জন কৃষক বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না, তারা বিভিন্ন তালবাহানা করছে। কিন্তু আমরা জমিতে ফসল ফলাতে না পারি, তাহলে বউ বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’

এ বিষয়ে ফিশারির মালিক আবুল হাসেম ও জনাব আলী বলেন, ‘এখনে শুধু আমাদের ফিশারির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা কিন্তু ঠিক না। এখানে আমাদের মতো আরও অনেক চাষি আছে। তারা সবাই যদি পানি নামার রাস্তা দেয় তাহলে আমরাও দেবো।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ কাইয়ুম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছরও একই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেবার ফিশারি ও পুকুরের বাঁধ কেটে দিলে কৃষকরা বোরো ও আমন ধান করেছিল। এ বছর আবারও একই সমস্যা। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।’

গৌরীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহার জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি শুনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। যারা অপরিকল্পিতভাবে ফিশারি বা পুকুর তৈরি করে এমন সমস্যার সৃষ্টি করেছে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তিন থেকে চার দিনের মধ্যে বাঁধ কেটে দিতে বলা হয়েছে। যদি এতে কাজ না হয়, পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মারুফ জাগো নিউজকে বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর সমাধানের জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মৎস কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া স্থানীয় চেয়ারম্যানকে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমন ধান লাগানোর আগেই সমস্যাটি সমাধান হবেও।’

মঞ্জুরুল ইসলাম/এসজে/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।