কাজ শেষ না করেই টাকা নিয়ে লাপাত্তা ঠিকাদার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর
প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২২

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সারাই নায়রা গ্রামে দুই কিলোমিটার পাকা সড়কসহ একটি সেতু এবং একটি কালভার্ট নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে প্রায় দেড় বছরে ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে উপজেলার কাচু মহেষওয়ালা মোড়-নায়রা সড়কের আট গ্রামের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রভাতী প্রকল্পের আওতায় এলজিইডির অধীনে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলার সারাই ইউনিয়নের কাচু মহিষওয়ালার মোড় বাজার থেকে নায়রা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত দুই কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং মানাস খালের ওপর ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু ও একটি কালভার্ট নির্মাণে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৪৮ লাখ ১৫ হাজার ১৯১ টাকা। তবে দরপত্রে ছাড় দিয়ে ২ কোটি ২১ লাখ ৯১ হাজার ৪৬৩ টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালের ৩ এপ্রিল কার্যাদেশ পায় কে জেড এইচ সি (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার সত্ত্বাধিকারী রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার কাশিপুর এলাকার এনামুল হক।

২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সড়ক ও সেতুর কাজ হয় ৭০ শতাংশ। তবে বাস্তবে ৬০ শতাংশের কম নির্মাণ কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর প্রায় দেড় বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই রাস্তা ও সেতু নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গতবছর ৭০ শতাংশ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ ২৯ হাজার ৬০১ টাকা বিল তুলেছে। বাকি কাজ সমাপ্ত হলে চুক্তি অনুযায়ী ৬৩ লাখ ৬১ হাজার ৮৬২ টাকা পাবে। কিন্তু এখনো দুই কিলোমিটার পাকা সড়কের ৩২ মিলিমিটার কার্পেটিং ও সিলকোড নির্মাণ অসমাপ্ত রয়েছে যার ব্যয় হবে প্রায় ৫০ লাখ এবং সড়ক ও সেতুর দুই প্রান্তে মাটি ভরাট বাকি আছে, যাতে ব্যয় হবে প্রায় ২১ লাখ এবং একটি কালভার্টে ব্যয় হবে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এছাড়া সড়কের বাকি কাজ, সেতুর অ্যাপ্রোচ, রেলিংসহ আনুসঙ্গিক নির্মাণ কাজে ব্যয় হবে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা। সূত্রের হিসাব মতে, প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ টাকার নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপ-সহকারী প্রকৌশলী জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোট নির্মাণ কাজের চেয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বেশি টাকা বিল তুলেছে। এরপর তারা কাজ বন্ধ করে দেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেতুর পশ্চিম প্রান্তে মদামুদন, বকুলতলা, নোয়াখালীটারী, কাচু মধ্যপাড়া গ্রামসহ একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি মাধ্যমিক স্কুল, দুইটি প্রাথমিক স্কুল ও একটি মাদরাসা, বাজার এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর পূর্ব প্রান্তে ঢুলিপাড়া, রামচন্দ্রপুর, সটিপাড়া, মাছহাড়ী গ্রামসহ একটি মাধ্যমিক স্কুল, দুইটি প্রাথমিক স্কুল ও একটি মাদরাসা, হাট-বাজার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ মহেষওয়ালা বাজার থেকে নায়রা সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। সেতু ও পাকা সড়কের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় তারা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সারাই নায়রা গ্রামে মানাস খালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে নির্মাণাধীন অসমাপ্ত সেতু। সেতুর রেলিং ও অ্যাপ্রোস এবং দুইপ্রান্তে সংযোগ সড়ক নেই। এছাড়া দুই কিলোমিটার সড়কে ইটের খোয়া ও বালু ফেলা হয়েছে তবে কার্পেটিং বাকি। এছড়া নির্মাণ কাজের কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। স্থানীয় লোকজন সেতুর দুই প্রান্তে কাঠের সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছেন।

jagonews24

সেখানে কথা হয় নায়রা গ্রামের সহিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, সেতু এবং সড়ক নির্মাণের কাজ প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রকৌশলী বা ঠিকাদারের লোকজন আসে না।

নায়রা এলাকার বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম জানান, মানাস খালের ওপর একটি সেতু ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রায় দুই বছর আগে সেতুটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু সেতুটি এবং সড়কের নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আট গ্রামের মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, উপজেলা সদরসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাট-বাজারের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে এই সেতুটি। সংযোগ সড়ক না থাকায় গ্রামের লোকজন যাতায়াতের জন্য বিকল্প হিসেবে সেতুর দুই প্রান্তে কাঠের সাঁকো নির্মাণ করে। তবে সেটিও খুবই নড়বড়ে। সাঁকো পারাপার হতে গিয়ে স্কুলগামী শিশু এবং পথচারীরা পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

ওই গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য সামছুল হক বলেন, ঠিকাদার সেতু এবং সড়কের নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায়। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় এলাকার মানুষদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে খুবই সমস্যায় পড়তে হয় স্বজনদের।

বকুলতলা গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ধানসহ উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজে জেলা সদরের বিভিন্ন বাজারে নিতে পারি না। আমাদের কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে।

সারাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নের সেতু ও সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির বিষয়টি উপজেলার মাসিক সমন্বয় সভায় এবং প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঠিকাদার এনামুল হক জানান, প্রভাতী প্রকল্পের আওতায় ডব্লিউ ৭৪ নম্বর প্যাকেজের নির্মাণ কাজ নিয়ে তিনি খুবই সমস্যায় পড়েছেন। কাজটি তিনি করছেন না, তার লাইসেন্স নিয়ে শহরের এক ঠিকাদার টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পান এবং সেই ব্যক্তি নির্মাণ কাজ শুরু করেন। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় ওই ঠিকাদার দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখেছেন।

তিনি বলেন, কাজ শুরু করার জন্য উপজেলা প্রকৌশলী বেশ কয়েকবার চিঠিও দিয়েছেন। কিন্তু লাইসেন্স তার হওয়ার কারণে নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় থেকে তাকে চাপ দেওয়া হয়। অবশেষে তিনি গত মাসে প্যাকেজের অসমাপ্ত নির্মাণ কাজ করতে পারবেন না বলে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। তবে কাজের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা উত্তোলনের বিষয় এনামুল হক কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জেমী বলেন, প্রভাতী প্রকল্পের ডব্লিউ ৭৪ নম্বর প্যাকেজের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিকাদারকে বেশি বিল দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাজের চেয়ে অতিরিক্ত বিল দেওয়া সুযোগ নেই। কারণ উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে তদারকি করে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে সেই মোতাবেক ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে ৭০ শতাংশ নির্মাণ কাজ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল হক বলেন, প্রভাতী প্রকল্পের ডব্লিউ ৭৪ নম্বর প্যাকেজের অসমাপ্ত নির্মাণ কাজ শুরু করার জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কার্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করে ঢাকা অফিসে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

জিতু কবীর/এমআরআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।